প্রখ্যাত নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত তার অভিনীত নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমেই এই আন্তর্জাতিক মাইলফলক রচিত হয়েছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা, যা জাতীয় সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশীয় সিনেমার জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার অংশগ্রহণ থাকলেও, ভেনিসের মতো আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে লড়াই করার সুযোগ এবারই প্রথম এসেছে।
রূপালি পর্দায় সুনেরাহ বিনতে কামালের পদচারণা খুব বেশি দিনের না হলেও, নিজের অসামান্য অভিনয়দক্ষতা ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে তিনি এরই মধ্যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প বা ঢালিউডে এক স্বতন্ত্র ও শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন।
ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমাতেই প্রান্তিক এক নারীর চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ নিজের ঝুলিতে পুরে নিয়েছিলেন। সেই অভাবনীয় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তিনি নিজেকে কেবল দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রতিভাকে মেলে ধরার এক অনন্য সুযোগ লাভ করেছেন।
বিনোদন জগতের বিশ্লেষকদের মতে, একজন তরুণ অভিনয়শিল্পীর জন্য ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুতে এমন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত গৌরবের এবং একই সঙ্গে তা তার দীর্ঘমেয়াদি অভিনয়জীবনের এক বিশাল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সারা বিশ্বের সিনেমাপ্রেমী, খ্যাতিমান নির্মাতা ও কড়া সমালোচকদের কাছে এক তীর্থস্থানের মতো। ফ্রান্সের কান এবং জার্মানির বার্লিন উৎসবের পাশাপাশি এটি বিশ্বের প্রধান তিনটি সম্মানজনক চলচ্চিত্র উৎসবের একটি হিসেবে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত।
এমন একটি বিশ্বমানের আসরে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ চলচ্চিত্রের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন পাওয়াটা নিঃসন্দেহে পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন এবং পুরো নির্মাণ দলের জন্য এক অসামান্য ও ঈর্ষণীয় অর্জন। রুবাইয়াত হোসেন বরাবরই তার চলচ্চিত্রে নারীকেন্দ্রিক গল্প ও সমাজের নানা মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নির্মিত তার এই নতুন চলচ্চিত্রটি যখন বিশ্বের বাঘা বাঘা নির্মাতাদের কাজের সঙ্গে উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে লড়াই করবে, তখন তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ক্রমবর্ধমান গুণগত মান ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাকেই নতুন করে প্রমাণ করবে।
এই অর্জনের সরাসরি অংশীদার হতে পেরে সুনেরাহ নিজেও অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত এবং একই সঙ্গে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারায় দারুণভাবে গর্বিত। ইতালির দৃষ্টিনন্দন ভেনিস শহরে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মানজনক আসরে যোগ দিতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে সুনেরাহ বিনতে কামালের।
সেখানে তিনি ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ চলচ্চিত্রের অন্যান্য অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে লাল গালিচায় হাঁটবেন এবং উৎসবের নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনে সরাসরি অংশগ্রহণ করবেন। তবে এই ঐতিহাসিক ও জমকালো আমন্ত্রণকে তিনি কেবল নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের একটি সাময়িক প্রাপ্তি বা সাফল্য হিসেবেই দেখছেন না।
বরং আন্তর্জাতিক এই সুবিশাল মঞ্চকে তিনি নিজের অভিনয়সত্তা বিকাশের এবং চলচ্চিত্র শিল্পের বৃহত্তর পরিমণ্ডল থেকে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের এক অসাধারণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের মতো আয়োজনে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নামীদামি ও প্রথিতযশা চলচ্চিত্র নির্মাতা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকা অভিনয়শিল্পী, আন্তর্জাতিক প্রযোজক এবং প্রবীণ সিনেমা বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত থাকেন।
তাদের সবার সঙ্গে একই ছাদের নিচে অবস্থান করা, মতবিনিময় করা এবং বিশ্বচলচ্চিত্রের সমসাময়িক নানা ধারা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা লাভ করা যেকোনো দেশীয় শিল্পীর জন্যই এক অমূল্য ও জীবন বদলে দেওয়া অভিজ্ঞতা।
সুনেরাহ গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, আন্তর্জাতিক এই সফর তার শিল্পবোধকে আরও শাণিত করবে এবং তার অভিনয় যাত্রায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। বিশ্বমঞ্চের এই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে আগামী দিনে তিনি দেশের দর্শকদের আরও পরিণত, সুনিপুণ ও বৈচিত্র্যময় কাজ উপহার দিতে পারবেন বলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।
সুনেরাহ বিনতে কামালের এই আন্তর্জাতিক পদচারণা আগামী প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের জন্যও এক বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে, যা তাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রমাণ করার স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করবে।