২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নো টাইম টু ডাই’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে খ্যাতিমান অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেগ যখন বন্ড চরিত্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন, ঠিক তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয় নতুন জল্পনা-কল্পনা-কে হচ্ছেন পরবর্তী জেমস বন্ড?
দীর্ঘ প্রতীক্ষা, বিস্তর জল্পনা ও কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার পর অবশেষে জেমস বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন মুখ খোঁজার এই মহাযজ্ঞ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বিনোদন সংবাদমাধ্যমগুলোর নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহান্তেই যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চরিত্রটির জন্য চূড়ান্ত অডিশন বা ক্যামেরার সামনের পরীক্ষা।
এই অত্যন্ত সীমিত ও সুনির্দিষ্ট তালিকায় থাকা উদীয়মান অভিনেতাদের মধ্য থেকেই হয়তো বিশ্ববাসী পেয়ে যাবে তাদের পরবর্তী আইকনিক ব্রিটিশ স্পাইকে। এই চূড়ান্ত অডিশনে অংশ নিতে যাওয়া হাতেগোনা কয়েকজন অভিনেতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে ক্যালাম টার্নার এবং জনপ্রিয় থ্রিলার সিরিজ ‘স্লো হর্সেস’ খ্যাত তারকা জ্যাক লোডেনের নাম।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে যে, এই দুজন উদীয়মান ও প্রতিভাবান ব্রিটিশ অভিনেতা লন্ডনে আয়োজিত এই অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ স্ক্রিন টেস্ট বা ক্যামেরার সামনের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবেন।
জেমস বন্ডের মতো এমন একটি সর্বজনীন, সুপরিচিত ও প্রভাবশালী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কেবল সুদর্শন চেহারা বা সাধারণ অভিনয় দক্ষতাই যথেষ্ট নয়। তাই এই চূড়ান্ত পরীক্ষায় নির্মাতারা মূলত তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখবেন।
এগুলো হলো-অ্যাকশন বা স্টান্ট করার শারীরিক সক্ষমতা ও ক্ষিপ্রতা, ক্যামেরার সামনে অভিনেতার নিজস্ব উপস্থিতি বা ‘স্ক্রিন প্রেজেন্স’, এবং সেই সঙ্গে জেমস বন্ডের স্বভাবসুলভ তীক্ষ্ণ, মার্জিত ও আভিজাত্যপূর্ণ সংলাপ বলার সহজাত ক্ষমতা।
হলিউডের ভেতরের খবর অনুযায়ী, বর্তমানে এই দৌড়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা অভিনেতার সংখ্যা মাত্র তিন থেকে পাঁচজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ড্যানিয়েল ক্রেগ জেমস বন্ড চরিত্রে যে অনন্য মাত্রা, শারীরিক কসরত ও মানসিক গভীরতা যোগ করেছিলেন, তার যোগ্য বিকল্প খুঁজে বের করা বর্তমান নির্মাতাদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ থেকে শুরু করে ‘নো টাইম টু ডাই’ পর্যন্ত ক্রেগের দীর্ঘ যাত্রা বন্ড চরিত্রটিকে এক নতুন প্রজন্মের কাছে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল। তাই তার রেখে যাওয়া বিশাল শূন্যস্থান পূরণের দায়িত্বটি যে কতটা ভারী, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
নতুন বন্ড হিসেবে গত কয়েক বছরে অনেক বিশ্বখ্যাত তারকার নামই গণমাধ্যমে ভেসে বেড়িয়েছে। তবে বিখ্যাত বিনোদন সাময়িকী হলিউড রিপোর্টার নিশ্চিত করেছে যে, আগে নানা ধরনের জোরালো জল্পনা থাকলেও ‘সিনার্স’ সিনেমা খ্যাত তারকা জ্যাক ও’কনেল এবং ‘উদারিং হাইটস’-এর আলোচিত অভিনেতা জ্যাকব এলর্ডি এই চূড়ান্ত অডিশন প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন না।
এর মাধ্যমে অনেক ভিত্তিহীন গুঞ্জনের অবসান ঘটেছে এবং জেমস বন্ড খোঁজার এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাটি এখন আরও বেশি নির্দিষ্ট ও ঘনীভূত হয়েছে। জেমস বন্ডের নতুন যুগের এই যাত্রায় শুধু অভিনয়শিল্পীই নয়, ক্যামেরার পেছনের কারিগরদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের চমক অপেক্ষা করছে দর্শকদের জন্য।
অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওর ব্যানারে জেমস বন্ড সিরিজের পরবর্তী এই মেগা প্রজেক্টটি পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করবেন হলিউডের বর্তমান সময়ের অন্যতম দূরদর্শী ও প্রশংসিত নির্মাতা ডেনিস ভিলনভ। ‘ডুন’ বা ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’-এর মতো মহাকাব্যিক সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি ইতিমধ্যেই বিশ্ব চলচ্চিত্রে নিজের অসামান্য দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সিনেমাটির চিত্রনাট্য লেখার দায়িত্ব বর্তেছে বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় ব্রিটিশ ক্রাইম ড্রামা ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এর খ্যাতিমান স্রষ্টা স্টিভেন নাইটের কাঁধে। এমন দুজন সৃজনশীল মহারথীর সমন্বয়ে নতুন জেমস বন্ড সিনেমাটি যে একটি ভিন্নধর্মী, শ্বাসরুদ্ধকর ও অসামান্য সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতা উপহার দেবে, তা নিয়ে চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই।
জেমস বন্ড সিরিজের মালিকানা ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও সম্প্রতি বড় ধরনের ব্যবসায়িক ও কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালে ৮৪৫ কোটি মার্কিন ডলারের এক বিশাল ও ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার (এমজিএম) স্টুডিওর স্বত্ব কিনে নেয় বৈশ্বিক টেক জায়ান্ট অ্যামাজন।
এই যুগান্তকারী চুক্তির ফলে জেমস বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির ওপর তাদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অংশীদারিত্ব তৈরি হয়। শুধু তাই নয়, গত বছর বন্ড সিরিজের মূল নিয়ন্ত্রক ব্রকলি পরিবারের কাছ থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির সম্পূর্ণ ‘সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ’ বা ক্রিয়েটিভ কন্ট্রোল নিজেদের একক হাতে নিতে আরও ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছে অ্যামাজন।
বিপুল এই আর্থিক বিনিয়োগ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বিশ্ববিখ্যাত এই গুপ্তচর চরিত্রটিকে ঘিরে তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক ও সৃজনশীল পরিকল্পনা কতটা সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি। তবে নতুন বন্ড নির্বাচনের চূড়ান্ত খবর নিয়ে গণমাধ্যমে যখন তুমুল আলোচনা চলছে, তখন অ্যামাজন কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি।
হলিউড রিপোর্টারের এক সরাসরি প্রশ্নের জবাবে তারা অত্যন্ত কৌশলে তাদের পূর্বের একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির কথাই গণমাধ্যমকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। অ্যামাজনের সেই পূর্ববর্তী বিবৃতিতে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে বলা হয়েছিল, ‘পরবর্তী জেমস বন্ড খোঁজার জটিল ও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াটি বর্তমানে চলমান রয়েছে।
অভিনেতা নির্বাচনের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নিয়ে জনসমক্ষে মন্তব্য করার কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে আমাদের নেই। তবে সঠিক সময় এলে ০০৭-এর অগণিত ভক্তদের সঙ্গে আমরা আরও রোমাঞ্চকর খবর ভাগ করে নিতে গভীরভাবে আগ্রহী।’
এর আগে গত এপ্রিল মাসেও অ্যামাজনের চলচ্চিত্র বিভাগের শীর্ষ নির্বাহীরা নতুন জেমস বন্ডের নাম ঘোষণার বিষয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভক্তদের ধৈর্য ধারণ করার বিনীত আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তারা স্পষ্ট করেছিলেন যে, এত বড় মাপের ও বহুল আলোচিত একটি চরিত্রের জন্য নতুন অভিনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা, সময় ও পেশাদারিত্বের সঙ্গেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হচ্ছে।
সে সময় অ্যামাজনের চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান কোর্টনি ভ্যালেন্তি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বলেছিলেন, ‘আমি খুব ভালো করেই জানি, পরবর্তী জেমস বন্ডের কালজয়ী চরিত্রে কে অভিনয় করতে যাচ্ছেন, তা কবে নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে-সেটি জানার জন্য আপনারা সবাই চরম অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
তবে আমাদের বিনীত অনুরোধ থাকবে, এখনই খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হবেন না। আমরা অত্যন্ত যত্নশীল হয়ে এবং এই ঐতিহাসিক চরিত্রটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় রেখেই কাজটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে করে যাচ্ছি, সেটি আপনাদের মনে রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে জেমস বন্ড সিরিজের পরবর্তী অধ্যায়কে একটি নতুন ও আকর্ষণীয় রূপে তুলে ধরা আমাদের সবার জীবনের একটি অন্যতম বড় স্বপ্ন। আর কোনোভাবেই এই বিশাল দায়িত্বকে আমরা হালকা বা সাধারণ চোখে দেখছি না।’
নতুন সিনেমাটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করা ডেনিস ভিলনভ শুরু থেকেই নিজেকে জেমস বন্ড সিরিজের একজন ‘একনিষ্ঠ ও পাগল ভক্ত’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন। বিগত প্রায় এক দশক ধরে তিনি সায়েন্স ফিকশন মহাকাব্য ‘ডুন’ সিরিজের বিশাল জগৎ নির্মাণে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উজাড় করে দিয়েছেন।
বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজিতে কাজ করার এই বিরল সুযোগ তাকে সেই চেনা কল্পবিজ্ঞান জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবধর্মী গুপ্তচরবৃত্তির রোমাঞ্চকর পৃথিবীতে প্রবেশ করতে দারুণভাবে উৎসাহিত করেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। আগামী ডিসেম্বরেই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির কথা রয়েছে তার পরিচালিত ও বহুল প্রতীক্ষিত ‘ডুন: মেসায়া’ চলচ্চিত্রটির।
এই সিনেমাটি নিয়ে সম্প্রতি বিখ্যাত এম্পায়ার সাময়িকীকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ভিলনভ তার ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, ডুন-এর এই বিশাল কাজটি পুরোপুরি শেষ হলে আরাকিস (ডুন সিনেমার কল্পিত মরু গ্রহ) থেকে আমাকে অনেক দূরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য হয়তো শক্তিশালী কোনো রকেটের প্রয়োজন হবে।
কিন্তু যখন আমাকে পরবর্তী জেমস বন্ড সিনেমাটি পরিচালনার বিশাল প্রস্তাবটি দেওয়া হলো, তখন আমি নির্দ্বিধায় বললাম, ঠিক আছে, আমার এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’ জেমস বন্ড চরিত্রের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের ক্যামেরা পরীক্ষা বা স্ক্রিন টেস্টের এমন ব্যাপক ঘটনা সর্বশেষ ঘটেছিল দুই দশকেরও বেশি সময় আগে, যা চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
ওই সময়কার গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বর্তমানে সুপারম্যান চরিত্রে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পাওয়া তারকা হেনরি ক্যাভিলকে বন্ড চরিত্রের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল।
কিন্তু বয়সে অত্যন্ত তরুণ হওয়ায় সেবার হেনরি ক্যাভিল বাদ পড়েন এবং নির্মাতাদের কঠোর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে শেষ পর্যন্ত এই আইকনিক চরিত্রটি অর্জন করেন ড্যানিয়েল ক্রেগ। ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া শ্বাসরুদ্ধকর ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ সিনেমার মাধ্যমে ক্রেগ প্রথমবারের মতো জেমস বন্ড হিসেবে রুপালি পর্দায় হাজির হয়ে সারা বিশ্বে রীতিমতো ঝড় তুলেছিলেন।
এরপরের ইতিহাস সবারই জানা। এখন সেই একই ইতিহাসের এক নতুন পুনরাবৃত্তি ঘটার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে বিশ্ববাসী। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক বিনোদন প্রতিবেদনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবকিছু ঠিক থাকলে এই নতুন অভিনেতাকে নিয়ে জেমস বন্ড সিরিজের পরবর্তী মেগা সিনেমাটি আগামী ২০২৮ সালে বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার এক বিশাল পরিকল্পনা রয়েছে নির্মাতাদের।