বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে হাতিয়ার করে ভুয়া, বিকৃত ও সম্মানহানিকর ডিজিটাল আধেয় বা কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা বিশ্বজুড়েই একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির এই অন্ধকার দিকটি নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন বাংলাদেশের বিনোদন জগতের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রশংসিত অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী।
সাইবার জগতে মানুষের ব্যক্তিগত সম্মান ও সামাজিক নিরাপত্তার চরম অবক্ষয় নিয়ে তিনি যে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন, তা কেবল একজন বিনোদনকর্মীর ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়, বরং সমগ্র সমাজের বিবেকবোধের প্রতি এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন।
গত বৃহস্পতিবার, পনেরোই অক্টোবর সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি সুদীর্ঘ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় মেহজাবীন চৌধুরী বর্তমান সময়ের এই ভয়াবহ সাইবার অপরাধ এবং এর পেছনের সামাজিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো যেমন আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে প্রতিনিয়ত বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে আসছে, ঠিক তেমনি পেশাদারিত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এই অভিনেত্রী তার অনুসারী ও সাধারণ মানুষের প্রতি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও চিন্তার উদ্রেককারী বার্তা প্রদান করেছেন।
তার এই বার্তার মূল উপজীব্য ছিল, কীভাবে মানুষের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলাকে বর্তমানে সস্তা বিনোদনের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং কীভাবে সাধারণ মানুষ অজান্তেই বা স্বেচ্ছায় এই জঘন্য অপরাধের অংশীদার হয়ে উঠছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কারও ব্যক্তিগত পরিচয়, ছবি বা কণ্ঠস্বর বিকৃত করে ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, সেটিকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন মেহজাবীন।
তিনি তার বিবৃতিতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও নামে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করা এবং শুধুমাত্র কাউকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সাধারণ বিনোদন হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক সাইবার আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি সুনিশ্চিত অপরাধ। এই অপরাধকে বিনোদনের মোড়কে বৈধতা দেওয়ার যে অপচেষ্টা চলছে, তা একটি সুস্থ সমাজের জন্য চরম অশনিসংকেত বলে তিনি মনে করেন।
মেহজাবীন তার বক্তব্যে সমাজের মানুষের সামষ্টিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন সেই সব লাখো জনতার প্রতি, যারা বিচার-বিবেচনা না করেই এই ধরনের মানহানিকর কনটেন্টগুলো প্রতিনিয়ত শেয়ার করে চলেছেন।
তার মতে, যখন এই ধরনের একটি বিকৃত ও মিথ্যা কনটেন্ট শত শত বা হাজার হাজার মানুষ তাদের নিজস্ব টাইমলাইনে শেয়ার করেন এবং অন্যদের দেখার সুযোগ করে দেন, তখন সেটি আর কেবল ওই কনটেন্ট নির্মাতার একক অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বরং এটি সমগ্র সমাজের নৈতিক স্খলন ও অবক্ষয়ের একটি অত্যন্ত ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করে। একজন মানুষের সম্মানহানিকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের এই উল্লাস সমাজের ভিত্তিমূলকে নাড়িয়ে দেয়।
মেহজাবীন অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে প্রশ্ন তুলেছেন, একটি সভ্য সমাজ হিসেবে আমরা আজ ঠিক কোন অবক্ষয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে অন্যের সম্মানহানি আমাদের প্রধানতম বিনোদনের খোরাকে পরিণত হয়েছে।
আমাদের সমাজে একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথা বা মানসিকতা রয়েছে, যেখানে কোনো নারীর সম্মানহানির ঘটনা ঘটলে তাকে নিজের মা বা বোনের সাথে তুলনা করে সহমর্মিতা আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এই সেকেলে ও বৈষম্যমূলক মানসিকতার মূলে চরম আঘাত হেনেছেন মেহজাবীন চৌধুরী।
তিনি তার লেখায় অত্যন্ত সংবেদনশীল অথচ দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, এই পর্যায়ে এসে পুরোনো সেই বহুল ব্যবহৃত কথাটি বলতেও তার আর ইচ্ছে করে না যে- ‘ভাবুন তো, যদি এমনটা আপনার মা কিংবা বোনের সঙ্গে ঘটতো!’
তিনি মানবাধিকারের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি উত্থাপন করে বলেছেন, কাউকে একজন মানুষ হিসেবে নূন্যতম সম্মান প্রদর্শন করার জন্য তাকে কেন আমাদের নিজের পরিবারের সদস্য হতে হবে? একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ, যার সাথে আমাদের রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, তারও যে একটি স্বাধীন ও সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে, এই চিরন্তন সত্যটি অনুধাবন করার জন্য তিনি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান যুগে কনটেন্ট নির্মাণের পেছনের অর্থনীতি বা বাণিজ্যিক দিকটির কথাও মেহজাবীনের আলোচনায় অত্যন্ত সাবলীলভাবে উঠে এসেছে। বর্তমান ডিজিটাল অর্থনীতিতে ভিউ, লাইক, শেয়ার এবং ট্রেন্ডিংয়ে বা আলোচনার শীর্ষে থাকার যে এক অন্ধ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, তার নেতিবাচক দিকগুলো তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিশ্লেষণ করেছেন।
এই ধরনের ভাইরাল কনটেন্টগুলো থেকে যে বিদেশি মুদ্রা বা ডলার আয় হয়, সেটিও অনেকের কাছে একটি বড় প্রলোভন। মেহজাবীন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে স্বীকার করেছেন যে, মানুষের জীবনে অনেক কঠিন সংগ্রাম রয়েছে এবং এই তীব্র প্রতিযোগিতার বিশ্বে অনেকের জন্যই ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা এখন সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহের একটি অন্যতম প্রধান উপায়।
কিন্তু এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ার পাশাপাশি তিনি একটি অত্যন্ত কঠোর ও নৈতিক প্রশ্ন সমাজের বিবেকের কাছে ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, ঠিক কবে থেকে বা কোন সময় থেকে অন্য একজন মানুষকে চরমভাবে অপমান, অপদস্থ আর অসম্মান করা আমাদের উপার্জনের বা অর্থ রোজগারের একটি বৈধ মাধ্যম হয়ে উঠলো?
অন্যের জীবন ধ্বংস করে নিজের জীবিকা নির্বাহের এই অনৈতিক চর্চা কোনোভাবেই একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজের প্রতিচ্ছবি হতে পারে না। প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সাইবার বুলিংয়ের এই ভয়াবহ বিস্তৃতি যে এখন আর নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গ বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সেই নির্মম সত্যটিও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে মেহজাবীনের বার্তায়।
তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এটি এখন শুধু নারী কিংবা পুরুষের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে নেই। সামাজিক মাধ্যমে সস্তা ভিউ, এনগেজমেন্ট আর ট্রেন্ডিংয়ের এই অমানবিক প্রতিযোগিতা আজ লিঙ্গের সকল সীমারেখা ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছে।
এর অর্থ হলো, ক্ষতিকর ও মানহানিকর কিছু ছড়িয়ে দেওয়ার এই অসুস্থ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে যে কেউ, আবার ঠিক একইভাবে এর নির্মম শিকারও হতে পারে সমাজের যেকোনো নিরীহ মানুষ। এই ডিজিটাল হুমকির সামনে আজ নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রত্যেকেই সমানভাবে অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
সবশেষে মেহজাবীন চৌধুরী তার আলোচনার সবচেয়ে গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক দিকটি উন্মোচন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই পুরো প্রক্রিয়ায় তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় বা চিন্তায় ফেলে সেই নির্দিষ্ট মানুষটি নয়, যে কি না প্রযুক্তির আড়ালে বসে এমন বিকৃত ও মিথ্যা কনটেন্ট তৈরি করছে; বরং তাকে সবচেয়ে বেশি হতবাক করে সেই অসংখ্য সাধারণ মানুষ, যারা অত্যন্ত স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে এবং কোনো প্রকার অপরাধবোধ ছাড়াই সেই মিথ্যা কনটেন্টটি শেয়ার করছে এবং আরও হাজার হাজার মানুষের কাছে চোখের পলকে পৌঁছে দিচ্ছে।
এই নীরব সমর্থনকারীরাই মূলত মূল অপরাধীকে আরও বড় অপরাধ করতে উৎসাহিত করছে। তিনি তার বার্তার উপসংহারে সাধারণ নেটিজেনদের প্রতি একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছেন, একজন চিহ্নিত অপরাধীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিজের অজান্তেই অংশ নিয়ে নিজের বিবেকহীনতা ও অমানবিকতার পরিচয় আপনারা দেবেন কি না, তা এখন আপনাদেরই গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
প্রযুক্তির এই যুগে শুধু স্মার্টফোন ব্যবহার করলেই হবে না, বরং এর পাশাপাশি ডিজিটাল শিষ্টাচার, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চাও সমানভাবে জরুরি বলে তিনি মনে করেন।