বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আদালত প্রাঙ্গণে মেজাজ হারালেন পরীমনি

আর এন এস বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

আদালত প্রাঙ্গণে মেজাজ হারালেন পরীমনি
ছবি : Collected

বাংলাদেশের বিনোদন জগতের অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব চিত্রনায়িকা পরীমনি আবারও সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি চাঞ্চল্যকর আইনি লড়াইয়ের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত হয়ে তিনি জামিন লাভ করেছেন।

 

স্বনামধন্য ব্যবসায়ী এবং ঢাকা বোট ক্লাবের তৎকালীন কার্যনির্বাহী সদস্য নাসির উদ্দিন মাহমুদের দায়ের করা মারধর এবং হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগের মামলায় আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করতে তিনি এদিন আদালতে সশরীরে উপস্থিত হন।

 

তবে আইনি প্রক্রিয়ার এই আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এদিন আদালত প্রাঙ্গণের সার্বিক পরিস্থিতি এবং চিত্রনায়িকা পরীমনির অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনা সাধারণ মানুষ এবং গণমাধ্যমের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো যেমন কোনো তারকার আইনি লড়াইকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরে, ঠিক তেমনি এই ঘটনাটিও দেশের বিচারব্যবস্থা এবং তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনের জটিল সমীকরণের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার সকালের দৃশ্যপট ছিল অন্যান্য সাধারণ দিনের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং উত্তেজনায় পরিপূর্ণ। প্রাপ্ত তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, এদিন সকাল আনুমানিক সাড়ে নয়টার দিকে একটি সাদা রঙের ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে এসে পৌঁছান চিত্রনায়িকা পরীমনি।

 

একজন জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীর উপস্থিতি ঘিরে আদালত প্রাঙ্গণে আগে থেকেই ব্যাপক নিরাপত্তা এবং কৌতূহল বিরাজ করছিল। তার গাড়িটি আদালত চত্বরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়।

 

নায়িকার নিরাপত্তায় নিয়োজিত কালো পোশাক পরিহিত অন্তত দশজন সুঠামদেহী ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী দ্রুতগতিতে গাড়িটির চারপাশ ঘিরে ফেলে একটি দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেন। আদালতের আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রম শুরু হতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় পরীমনি বেশ কিছুক্ষণ তার গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করেন।

 

এ সময় বাইরের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হতে থাকে, কারণ তার উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন।

 

গাড়ির ভেতর অপেক্ষার প্রহর শেষে পরীমনি যখন আদালতের এজলাসের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য গাড়ি থেকে নেমে আসেন, তখন পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যায়। আদালত কক্ষে প্রবেশের দীর্ঘ পথটিতে সংবাদকর্মী এবং অসংখ্য উৎসুক জনতার এক বিশাল জটলা তৈরি হয়েছিল।

 

পেশাদার আলোকচিত্রী এবং সংবাদকর্মীরা তার ছবি ও বক্তব্য নেওয়ার জন্য রীতিমতো হুমড়ি খেয়ে পড়েন। এই বিপুল জনসমুদ্র এবং ভিড় ঠেলে সামনের দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে এই তারকা চরম শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন।

 

একদিকে উৎসুক জনতার প্রচণ্ড চাপ এবং অন্যদিকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য টানাটানি ও ধস্তাধস্তির কারণে চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মানসিক চাপ এবং শারীরিক অসুস্থতার ধকল সামলে এমন একটি দমবন্ধ করা পরিবেশে একপর্যায়ে তিনি তার স্বাভাবিক ধৈর্য ও মেজাজ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন।

 

সংবাদকর্মী এবং উপস্থিত জনতার এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড়ের প্রতি তিনি তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেন, যা একজন তারকার অসহায়ত্ব এবং জনসমক্ষে ব্যক্তিগত পরিসর ক্ষুণ্ণ হওয়ার চরম বাস্তবতাকে প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

 

আদালত প্রাঙ্গণের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও সাময়িক উত্তেজনার পর তিনি এজলাসে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। সেখানে তিনি তার নিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন এবং নতুন করে জামিন আবেদন দাখিল করেন।

 

বিচারক সার্বিক পরিস্থিতি এবং আইনি যুক্তিতর্ক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে এদিন তার জামিন আবেদনটি মঞ্জুর করেন, যা তার জন্য একটি বড় ধরনের আইনি স্বস্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই আদেশের ফলে আপাতত তাকে কারাবাস বা পুলিশি হেফাজতে যাওয়ার মতো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে না।

 

এই চাঞ্চল্যকর জামিন লাভের পেছনের আইনি প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল মূলত ঠিক এর আগের দিন, অর্থাৎ বুধবারের একটি কঠোর বিচারিক আদেশের মাধ্যমে। পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বুধবার এই আলোচিত মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা ছিল। কিন্তু চিত্রনায়িকা পরীমনি সেদিন আদালতে সশরীরে উপস্থিত হতে চরমভাবে ব্যর্থ হন।

 

তার অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে আদালতে নিযুক্ত আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভী একটি পিটিশন বা সময়ের আবেদন দাখিল করেছিলেন। ওই আবেদনে আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, তার মক্কেল ত্বকের সংবেদনশীলতা বা অ্যালার্জিজনিত অসুস্থতার কারণে প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন এবং এই আকস্মিক স্বাস্থ্যগত অবনতির কারণেই তিনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালতে হাজির হতে পারেননি।

 

তবে আসামিপক্ষের এই দাবির চরম বিরোধিতা করেন বাদীপক্ষের আইনজীবীরা। মামলার বাদী ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী আবুল কালাম মোহাম্মদ সোহেল অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আদালতের কাছে আসামির জামিন বাতিলের আবেদন জানান।

 

তিনি তার আইনি যুক্তিতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, আসামি কোনো ধরনের যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতে অনুপস্থিত থেকে বারবার সময়ের আবেদন দাখিল করছেন, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দীর্ঘায়িত করা।

 

তিনি আদালতকে আরও জানান যে, এই ধরনের বিলম্বের ফলে আদালতের মহামূল্যবান সময়ের অপচয় হচ্ছে। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের এই দীর্ঘ ও উত্তপ্ত আইনি যুক্তিতর্ক শোনার পর ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান আসামিপক্ষের সময়ের আবেদনটি সরাসরি নাকচ করে দেন।

 

একই সঙ্গে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় গাফিলতির অভিযোগে আসামির জামিন বাতিল করে তার বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন এবং মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৩ ডিসেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। সেই গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই বৃহস্পতিবার সকালে তাকে আদালতে হাজির হতে হয়েছিল।

 

এই আইনি বিরোধ এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের শেকড় প্রোথিত রয়েছে বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিক তিক্ততা এবং একটি সংঘাতপূর্ণ ঘটনার মধ্যে। ২০২১ সালের ৬ জুলাই ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজীব হাসানের আদালতে ঢাকা বোট ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি এবং স্বনামধন্য ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ বাদী হয়ে এই চাঞ্চল্যকর মামলাটি দায়ের করেছিলেন।

 

এই মামলায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিত্রনায়িকা পরীমনির নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি তার অপর দুই সহযোগী ফাতেমা তুজ জান্নাত বনি এবং জুনায়েদ বোগদাদী জিমিকেও আসামি করা হয়। ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের দায়ের করা মামলার মূল এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর এবং চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে।

 

এজাহারে বাদী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পরীমনি এবং তার সহযোগীরা নিয়মিতভাবে অ্যালকোহল বা পানীয় সেবনে অভ্যস্ত। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা প্রায়শই সুযোগ বুঝে রাজধানীর বিভিন্ন নামিদামি এবং অভিজাত বিনোদনকেন্দ্রে প্রবেশ করেন এবং প্রচুর পরিমাণে পানীয় গ্রহণ করেন।

 

শুধু তাই নয়, আর্থিক মূল্য পরিশোধ না করেই তারা বিভিন্ন পানীয় নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যান বলেও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে। বাদী আরও অভিযোগ করেন যে, কেউ এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে পরীমনি তার পরিচিত কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে সাধারণ মানুষদের হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।

 

ঘটনার নির্দিষ্ট বিবরণ দিয়ে এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ৯ জুন মধ্যরাতের পর, অর্থাৎ রাত বারোটার দিকে আসামিরা সাভারের বোট ক্লাবের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা দ্বিতীয় তলার শৌচাগার ব্যবহার করেন এবং পরবর্তীতে ক্লাবের ভেতরে বসে দীর্ঘক্ষণ ধরে অ্যালকোহল পান করেন।

 

মূলত সেই রাতের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, বিনামূল্যে পানীয় দাবি করা এবং তৎপরবর্তী বাদানুবাদের জের ধরেই এই দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছে, যা আজও দেশের বিচারালয়ে বিচারাধীন।

 

খ্যাতির বিড়ম্বনা এবং আইনি জটিলতা-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একজন জনপ্রিয় তারকার জীবনযাত্রা এখন অনেকটাই আদালতকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানের বিচারব্যবস্থার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সত্য প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

 

একটি অত্যন্ত জটিল অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে এই মামলাটি শুরু হলেও দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে এর বিচারকাজ অগ্রসর হচ্ছে। সমগ্র দেশবাসী এবং গণমাধ্যম এখন গভীর আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছে এই চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার একটি অনন্য নজির স্থাপন করবে বলে সচেতন মহল গভীরভাবে বিশ্বাস করে।