বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে একটি সাদা রঙের গাড়িতে চড়ে তিনি ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছান। তবে এ দিন আদালতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
নায়িকার গাড়ির চারপাশে কালো পোশাক পরিহিত অন্তত দশজন সুঠামদেহী ব্যক্তিগত দেহরক্ষী কড়া নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে রাখেন। মামলার আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত পরীমনি নিজের গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করছিলেন।
আদালত চত্বরে উপস্থিত সাধারণ মানুষ এবং সংবাদকর্মীদের প্রবল ভিড় এড়াতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই দশজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে এই নিরাপত্তারক্ষীদের ঘেরাটোপেই তাকে বিচারিক এজলাসে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
এই চাঞ্চল্যকর উপস্থিতির পেছনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ বুধবার। ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রাহমানের আদালতে এই আলোচিত মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু পূর্বনির্ধারিত এই বিচারিক কার্যক্রমে প্রধান আসামি পরীমনি সশরীরে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হন।
তার পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভী আদালতের কাছে সময়ের আবেদন করে একটি পিটিশন দাখিল করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন যে, তার মক্কেল অ্যালার্জিজনিত শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন এবং এই আকস্মিক স্বাস্থ্যগত অবনতির কারণেই তিনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালতে হাজির হতে পারেননি।
তবে এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেন বাদীপক্ষ। মামলার বাদী ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী আবুল কালাম মোহাম্মদ সোহেল পরীমনির জামিন বাতিলের আবেদন জানিয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি তার যুক্তিতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, আসামি কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতে অনুপস্থিত থেকে বারবার সময়ের আবেদন দাখিল করছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বিচার প্রক্রিয়াকে প্রলম্বিত করা।
এর ফলে দেশের বিচারব্যবস্থার এবং আদালতের অত্যন্ত মূল্যবান সময়ের অপচয় হচ্ছে। উভয় পক্ষের দীর্ঘ আইনি যুক্তিতর্ক শোনা এবং সার্বিক পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার পর বিচারক আসামিপক্ষের সময়ের আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন।
একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী চিত্রনায়িকা পরীমনির বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন এবং মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৩ ডিসেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
এই আইনি বিরোধের শেকড় প্রোথিত রয়েছে বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিক তিক্ততার মধ্যে। ২০২২ সালের ৬ জুলাই ঢাকা বোট ক্লাবের সাবেক সভাপতি ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ বাদী হয়ে এই চাঞ্চল্যকর মামলাটি দায়ের করেছিলেন।
মামলায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিত্রনায়িকা পরীমনির নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি তার অপর দুই সহযোগী ফাতেমা তুজ জান্নাত বনি এবং জুনায়েদ বোগদাদী জিমিকেও আসামি করা হয়। এই মামলার আইনি প্রক্রিয়াও বেশ দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল।
দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি পর্যালোচনার পর গত ২০২৫ সালের ২৬ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অভিযোগ গঠনের সেই গুরুত্বপূর্ণ দিনেও পরীমনি আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন, যার ফলে সেই সময়েও আদালত তার বিরুদ্ধে একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।
তবে পরোয়ানা জারির ঠিক পরদিন তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আদালতে সশরীরে আত্মসমর্পণ করেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জামিন লাভ করতে সক্ষম হন। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, বারবার শুনানির দিনে অনুপস্থিত থাকা এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরদিনই আদালতে উপস্থিত হওয়ার এই পুনরাবৃত্তি মামলার স্বাভাবিক গতিশীলতাকে কিছুটা হলেও ব্যাহত করছে।
ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের দায়ের করা মামলার এজাহারে ঘটনার রাতের যে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা রীতিমতো রোমহর্ষক এবং বিতর্কিত। এজাহারে বাদী সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে, পরীমনি এবং তার সহযোগীরা নিয়মিত মদ্যপানে অভ্যস্ত।
২০২১ সালের ৮ জুন মধ্যরাতের পর, অর্থাৎ রাত বারোটার দিকে আসামিরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাভারের আশুলিয়ায় অবস্থিত ঢাকা বোট ক্লাবের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সেখানে অবস্থানকালে তারা যথেচ্ছভাবে পানীয় গ্রহণ করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, মদ্যপানের একপর্যায়ে পরীমনি ক্লাবের একটি অত্যন্ত দামি বিদেশি মদের বোতল কোনো প্রকার মূল্য পরিশোধ ছাড়াই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে চান। ক্লাবের নিয়মানুযায়ী বিনামূল্যে এই ধরনের দামি পানীয় সরবরাহে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দাবি পূরণ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে পরীমনি ক্লাবের ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর শুরু করেন এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন। রাত আনুমানিক সোয়া একটার দিকে বাদী নাসির উদ্দিন মাহমুদ যখন ক্লাব ত্যাগ করে নিজ গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে পরীমনি তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ডাক দেন।
এজাহারের বর্ণনানুযায়ী, ডাক পেয়ে নাসির উদ্দিন মাহমুদ সেখানে গেলে পরীমনি অত্যন্ত অশ্লীল ও আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন এবং পুনরায় সেই দামি মদের বোতলটি বিনামূল্যে দিয়ে দেওয়ার জন্য অন্যায্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন।
বাদী এই অনৈতিক ও বেআইনি প্রস্তাবে দৃঢ়ভাবে অসম্মতি জ্ঞাপন করলে পরীমনি প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং তাকে লক্ষ্য করে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ শুরু করেন। তাদের মধ্যে বাদানুবাদ যখন চরমে পৌঁছায়, তখন একপর্যায়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পরীমনি একটি কাঁচের পানপাত্র সজোরে বাদীর দিকে ছুড়ে মারেন।
শুধু তাই নয়, হাতের কাছে থাকা একটি মুঠোফোনও তিনি নাসিরের দিকে নিক্ষেপ করেন। এই আকস্মিক ও হিংস্র হামলায় ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের মাথা এবং বুকে মারাত্মক আঘাত লাগে। মূলত এই শারীরিক আঘাত, ক্লাবের সম্পত্তি বিনষ্টকরণ এবং হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগের ভিত্তিতেই এই আইনি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছে।
তবে এই পুরো ঘটনার একটি ভিন্ন ও অত্যন্ত আলোচিত প্রেক্ষাপটও রয়েছে, যা বাংলাদেশের গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সংবাদের শিরোনাম হয়ে আছে। নাসির উদ্দিন মাহমুদের এই মামলাটি মূলত একটি পাল্টা আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
কারণ এর আগে ২০২১ সালের ১৪ জুন পরীমনি নিজেই সাভার মডেল থানায় একটি গুরুতর মামলা দায়ের করেছিলেন। সেই মামলায় তিনি ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ এবং তার বন্ধু অমির বিরুদ্ধে ঢাকা বোট ক্লাবের অভ্যন্তরে তাকে শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণচেষ্টা এবং হত্যাচেষ্টার মতো ভয়াবহ অভিযোগ এনেছিলেন।
সেই সময় পরীমনির এই অভিযোগ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ সে সময় পরীমনির পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
যদিও পরবর্তীতে পরীমনির নিজের বাসভবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর তার বিরুদ্ধে একটি পৃথক মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলা দায়ের করা হয়, যা তাকে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করতে বাধ্য করেছিল।
পরস্পরবিরোধী এই মামলাগুলো বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা এবং বিনোদন জগতের জন্য একটি নজিরবিহীন ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ক্লাবের সম্মান এবং নিজের ওপর হওয়া হামলার ন্যায়বিচার চাইছেন, অন্যদিকে রূপালি পর্দার এক জনপ্রিয় তারকা নিজের সম্মান ও নিরাপত্তার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বারবার আদালতে হাজিরা, গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে পরীমনির জীবনযাত্রা এখন অনেকটাই আদালতকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।
কালো পোশাকের দশজন নিরাপত্তারক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে তার এই সাম্প্রতিক উপস্থিতি কেবল একটি আইনি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক ও বিচারিক প্রেক্ষাপটে তারকাদের জীবনের জটিল বাস্তবতাকেই নতুন করে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে।
এখন দেখার বিষয়, আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে এই দীর্ঘ ও জটিল বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কীভাবে ঘটে এবং আগামী দিনগুলোতে দেশের বিচারব্যবস্থা এই চাঞ্চল্যকর মামলার কী রায় প্রদান করে।