বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬
২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

আর এন এস বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিনোদন জগতের আলোচিত ও বিতর্কিত নাম চিত্রনায়িকা পরীমণির আইনি জটিলতা আরও একবার নতুন মোড় নিয়েছে। রাজধানীর সাভারের বোট ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের দায়ের করা মারধর, ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার মামলায় পরীমণির জামিন বাতিল করে তার বিরুদ্ধে নতুন করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

 

বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রাহমান এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি আদেশ প্রদান করেন। এই ঘটনাটি দেশের বিনোদন ও আইনি অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, কারণ পরীমণি এবং ব্যবসায়ী নাসিরের মধ্যকার এই আইনি লড়াই গত কয়েক বছর ধরেই দেশের অন্যতম চর্চিত একটি বিষয়।

 

আদালত এবং আইনি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার এই নির্দিষ্ট মামলাটির পূর্বনির্ধারিত শুনানির দিন ধার্য ছিল এবং ওই দিন মূলত সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণের কথা ছিল।

 

বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা অত্যন্ত জোরালোভাবে আসামিদের, বিশেষ করে পরীমণির জামিন বাতিলের জন্য আদালতের কাছে আবেদন উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে, আসামি পরীমণির পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে একটি সময়ের আবেদন বা সময় বাড়ানোর আরজি পেশ করেন।

 

পরীমণির অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে তার আইনজীবীরা আদালতকে অবহিত করেন যে, তিনি হঠাৎ করেই তীব্র অ্যালার্জিজনিত শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং এই অসুস্থতার কারণেই তার পক্ষে সরাসরি আদালতে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়নি।

 

তবে আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শোনার পর এবং সার্বিক পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে বাদীপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করেন। এর ফলশ্রুতিতে আদালত পরীমণির পূর্ববর্তী জামিন বাতিল ঘোষণা করে তার বিরুদ্ধে সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আনুষ্ঠানিক নির্দেশ প্রদান করেন।

 

এই মামলার আইনি প্রেক্ষাপট বেশ দীর্ঘ এবং ঘটনাবহুল। উল্লেখ্য যে, গত বছরের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার একটি বিচারিক আদালত এই একই মামলায় পরীমণিসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

 

সেই সময়ও আদালত পরীমণির বিরুদ্ধে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে পরীমণি নিজেই স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জামিন লাভ করে সাময়িক স্বস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু বুধবারের এই আদেশের পর তিনি পুনরায় আইনি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেলেন এবং যেকোনো সময় তাকে গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

 

এই মামলার তদন্তভার ন্যস্ত ছিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইয়ের ওপর। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, পিবিআই ঢাকা জেলার পরিদর্শক মো. মনির হোসেন দীর্ঘ এবং অত্যন্ত নিবিড় তদন্ত শেষে ২০২৪ সালে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন।

 

ওই প্রতিবেদনে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মামলার প্রধান আসামি চিত্রনায়িকা পরীমণি এবং তার কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমি ওরফে জিমের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদকে মারধর করা এবং ভয়ভীতি দেখানোর যে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল, প্রাথমিক তদন্তে তার সত্যতা পাওয়া গেছে।

 

তবে এই মামলার তৃতীয় আসামি ফাতেমা তুজ জান্নাত বনির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা সত্যতা তদন্তে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পিবিআইয়ের এই বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন।

 

প্রতিবেদন গ্রহণের পরপরই আদালত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া আসামি পরীমণি এবং তার কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমিকে সরাসরি আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করেন।

 

সেই সমনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ২৫ জুন তারা ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে জামিন আবেদন করলে, আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেছিলেন। পরীমণি এবং নাসির উদ্দিন মাহমুদের মধ্যকার এই বিরোধের মূল সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২১ সালে।

 

ওই বছরের ৬ জুলাই সাভারের ঢাকা বোট ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি ও ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ নিজেই বাদী হয়ে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজীব হাসানের আদালতে চিত্রনায়িকা পরীমণিসহ মোট তিনজনের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেন।

 

মামলার অন্য দুই আসামি হলেন পরীমণির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফাতেমা তুজ জান্নাত বনি এবং তার কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমি ওরফে জিম। এই মামলাটি দায়ের হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি দেশের মূলধারার গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

 

ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ তার দায়ের করা মামলার এজাহারে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, চিত্রনায়িকা পরীমণি এবং তার সহযোগীরা নিয়মিত অ্যালকোহল সেবনে অভ্যস্ত।

 

তারা প্রায়শই সুযোগ বুঝে রাজধানীর বিভিন্ন নামিদামি এবং বিলাসবহুল ক্লাবে প্রবেশ করে অননুমোদিতভাবে অ্যালকোহল পান করেন এবং অনেক সময় সেখান থেকে অ্যালকোহল পার্সেল হিসেবে নিয়ে গেলেও তার যথাযথ মূল্য পরিশোধ করেন না।

 

বাদী আরও একটি গুরুতর অভিযোগ এনে বলেন যে, পরীমণি তার পরিচিত কিছু ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর এবং হয়রানি করার ভয় দেখিয়ে থাকেন।

 

মামলার এজাহারে ঘটনার রাতের বিবরণ দিতে গিয়ে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালের ৯ জুন রাত বারোটার পর আসামিরা সাভারের ঢাকা বোট ক্লাবে অনধিকার প্রবেশ করেন এবং ক্লাবের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ওয়াশরুম ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে তারা ক্লাবের ভেতরের লাউঞ্জে বসে অ্যালকোহল সেবন করতে থাকেন।

 

বাদীর বিবরণ অনুযায়ী, ওইদিন রাত ১টা ১৫ মিনিটের দিকে বাদী নাসির উদ্দিন মাহমুদ এবং তার অপর এক সহযোগী শাহ শহিদুল আলম যখন কাজ শেষে ক্লাব ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে পরীমণি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে নাসিরকে ডাক দেন।

 

তারা নাসিরকে তাদের সাথে কিছুক্ষণ বসার জন্য অনুরোধ করেন। বাদীর অভিযোগ, কথোপকথনের এক পর্যায়ে পরীমণি অত্যন্ত অশোভন ও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নাসিরকে প্রলুব্ধ বা আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন এবং তাকে ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি দামি ‘ব্লু লেবেল’ অ্যালকোহলের বোতল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পার্সেল হিসেবে দেওয়ার জন্য জোরাজুরি ও চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন।

 

ক্লাবের নিয়ম পরিপন্থী হওয়ায় নাসির উদ্দিন মাহমুদ এই অন্যায় আবদারে রাজি হননি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পরীমণি তাকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতে শুরু করেন। নাসির উদ্দিন এবং আসামিদের মধ্যে এই বাদানুবাদের এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

 

মামলার এজাহার অনুযায়ী, তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে চরম উত্তেজিত হয়ে পরীমণি বাদীর দিকে একটি কাঁচের সারভিং গ্লাস সজোরে ছুড়ে মারেন এবং এরপর তার নিজের হাতে থাকা মোবাইল ফোনটিও বাদীর দিকে ছুড়ে মারেন।

 

এই অতর্কিত হামলায় নাসির উদ্দিন মাহমুদ তার মাথায় এবং বুকে মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। বাদী নাসির উদ্দিন মাহমুদ মামলায় আরও অভিযোগ করেন যে, পরীমণি এবং তার সহযোগীরা তাকে শুধুমাত্র মারধর করেই ক্ষান্ত হননি, বরং তাকে সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছেন এবং ক্লাবের মূল্যবান জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করেছেন।

 

মামলায় বাদী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দাবি করেন যে, বোট ক্লাবের ভেতরে ঘটানো নিজেদের এই উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ড এবং ভাঙচুরের ঘটনাটি সম্পূর্ণভাবে ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই পরীমণি পরবর্তীতে একটি সুকৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

 

তিনি উল্টো সাভার থানায় নিজে বাদী হয়ে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদসহ দুজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার মতো অত্যন্ত গুরুতর এবং মিথ্যা অভিযোগ তুলে একটি পালটা মামলা দায়ের করেন। মূলত পরীমণির দায়ের করা সেই মামলাটির পর থেকেই পুরো বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং নাসির উদ্দিন মাহমুদকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।

 

এখন নাসির উদ্দিনের করা এই মামলায় পরীমণির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পুরো আইনি প্রক্রিয়াটি নতুন করে কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য দেশের সাধারণ মানুষ এবং আইন বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, দেশের আইন সবার জন্য সমান এবং অপরাধ প্রমাণ হলে বিনোদন জগতের তারকাদেরও আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।