স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও ঢাকা বোট ক্লাবের তৎকালীন কার্যনির্বাহী সদস্য নাসির উদ্দিন মাহমুদের দায়ের করা একটি মামলায় নির্ধারিত দিনে আদালতে সশরীরে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হওয়ায় গত বুধবার, ৪ নভেম্বর ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রাহমান এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ প্রদান করেন।
তবে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পরদিন বৃহস্পতিবার সকালেই তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন এবং আইনিভাবে তা মঞ্জুর হয়। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমে নতুন করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে, যা দেশীয় বিনোদন অঙ্গনের সীমানা পেরিয়ে সাধারণ মহলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
একটি পুরোনো ও বিতর্কিত ঘটনা কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বিচারব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রেখেছে, এটি তারই একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। এই আইনি বিরোধের শেকড় প্রোথিত রয়েছে আজ থেকে কয়েক বছর আগে, ২০২১ সালের জুন মাসের একটি অভাবনীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
ওই বছরের ১৪ জুন চিত্রনায়িকা পরীমনি সাভার মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করে অভিযোগ করেন যে, ঢাকা বোট ক্লাবের অভ্যন্তরে তাকে শারীরিক নির্যাতন এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি করা হয় ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ এবং তার সহযোগী তুহিন সিদ্দিকী ও শাহ শহিদুল আলমসহ ছয়জনকে।
ঘটনার পরপরই নিজ বাসভবনে একটি জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন ডেকে পরীমনি গণমাধ্যমের সামনে অশ্রুসিক্ত নয়নে সেই রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছিলেন। তার সেই সংবাদ সম্মেলন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আবেগঘন স্ট্যাটাসগুলো সে সময় গোটা দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল।
নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ সে সময় পরীমনির পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তবে সময়ের পরিক্রমায় এবং আইনি তদন্তের গভীরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘটনার মোড় সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে ঘুরতে শুরু করে।
ঘটনার মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় ৬ জুলাই ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজীব হাসানের আদালতে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ বাদী হয়ে পরীমনি এবং তার দুই সহযোগী জুনায়েদ বোগদাদী জিমি ও ফাতেমা তুজ জান্নাত বনির বিরুদ্ধে একটি পাল্টা মামলা দায়ের করেন।
নাসির তার মামলায় অভিযোগ করেন যে, পরীমনি এবং তার সঙ্গীরা পরিকল্পিতভাবে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছেন, তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে মারধর করেছেন এবং প্রকাশ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন।
মূলত এই পাল্টা মামলা দায়েরের মাধ্যমেই পরীমনির নিজেকে একজন নিরপরাধ ভুক্তভোগী হিসেবে প্রমাণের আইনি লড়াইটি একটি অত্যন্ত জটিল ও প্রতিকূল সমীকরণের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।
মামলার তদন্তভার গ্রহণ করার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দেশের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সেই রাতের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা শুরু করে। তদন্ত চলাকালীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোট ক্লাবের অভ্যন্তরের একটি মাত্র দশ সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজ ফাঁস হয়ে গেলে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
পরীমনি তার প্রাথমিক অভিযোগে দাবি করেছিলেন যে, ঘটনার রাতে বোট ক্লাবের ভেতরে নাসির ও তার সঙ্গীরা তাকে জোরপূর্বক মদ্যপানে বাধ্য করেছিলেন এবং তিনি মদ পান করতে অস্বীকৃতি জানালে নাসির তার মুখের ভেতরে মদের বোতল ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু পরবর্তীতে ফাঁস হওয়া সেই ভিডিও ফুটেজে এমন কোনো জবরদস্তির দৃশ্য বা শারীরিক বলপ্রয়োগের নূন্যতম কোনো আলামত পরিলক্ষিত হয়নি। উল্টো দেখা যায়, পরীমনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বোট ক্লাবের ভেতরে তার সঙ্গীদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সংগ্রহ করা অন্যান্য ফুটেজে আরও দেখা যায় যে, পরীমনি নিজেই উল্টো ব্যবসায়ী নাসিরের সঙ্গে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও অশালীন আচরণ করছেন। বোট ক্লাবের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে তদন্তকারীরা ঘটনার সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন চিত্র পান।
স্টাফদের আনুষ্ঠানিক জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার রাতে পরীমনি তার সঙ্গীদের নিয়ে স্বেচ্ছায় ক্লাবে প্রবেশ করেন এবং একটি টেবিলে বসে স্বাভাবিক আড্ডায় মেতে ওঠেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ক্লাবের বার থেকে অত্যন্ত দামি একটি বিদেশি মদের বোতল নেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথম বচসার সূত্রপাত হয়।
ক্লাবের নিয়ম লঙ্ঘন করে সেই মদের বোতল জোরপূর্বক নিয়ে নেওয়া নিয়ে তর্কাতর্কি একপর্যায়ে চরম হাতাহাতি এবং বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ব্যবসায়ী নাসির মাহমুদ পরীমনিকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু উত্তেজিত পরীমনি তাকে লক্ষ্য করে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছেন এবং তাকে তার নিজস্ব ক্লাব থেকেই বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।
এই অকাট্য প্রমাণগুলো পরীমনির প্রাথমিক অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রবলভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয় এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করে যে, মূল ঘটনাটি সুকৌশলে আড়াল করে মিথ্যা অভিযোগ সাজানো হয়েছিল।
ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ তার দায়ের করা মামলার এজাহারে পরীমনির বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, পরীমনি এবং তার সহযোগীরা নিয়মিত অ্যালকোহল সেবনে অত্যন্ত অভ্যস্ত।
তারা প্রায়শই সুযোগ বুঝে রাজধানীর বিভিন্ন নামিদামি এবং অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করেন, প্রচুর পরিমাণে দামি অ্যালকোহল গ্রহণ করেন এবং অনেক সময় পার্সেল হিসেবে মদ নিয়ে গেলেও নিয়ম অনুযায়ী তার কোনো আর্থিক মূল্য পরিশোধ করেন না।
নাসির আরও অভিযোগ করেন যে, কেউ এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে পরীমনি তার পরিচিত কতিপয় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে সাধারণ মানুষদের হয়রানি করে থাকেন।
বোট ক্লাবের ঘটনার ঠিক আগের রাতে রাজধানীর গুলশানের অভিজাত অল কমিউনিটি ক্লাব এবং এর আগে বনানীর আরেকটি স্বনামধন্য ক্লাবে পরীমনির বিরুদ্ধে ব্যাপক ভাঙচুর এবং বার কর্মীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে আসে, যা নাসিরের করা অভিযোগগুলোর প্রাসঙ্গিকতাকে আরও জোরালো ও সুপ্রতিষ্ঠিত করে তোলে।
দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার পর অবশেষে ২০২৪ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এই চাঞ্চল্যকর মামলার একটি বিস্তৃত তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করে। তদন্তকারী দলের নিবিড় বিশ্লেষণে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদকে মারধর এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সত্যতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে পরীমনি এবং তার ব্যক্তিগত কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা পাওয়া যায়, যদিও অপর আসামি ফাতেমা তুজ জান্নাত বনির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি প্রমাণ মেলেনি।
ঢাকার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পুলিশের দেওয়া এই বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত প্রতিবেদনটি সন্তোষজনক হিসেবে গ্রহণ করেন এবং অভিযুক্তদের আদালতে সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য আইনি সমন জারি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৫ জুন পরীমনি ও জিমি আদালতে আত্মসমর্পণ করে সাময়িক জামিন লাভ করেছিলেন।
একটি অতিরঞ্জিত অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে অন্যকে ফাঁসাতে গিয়ে কীভাবে একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি নিজেই দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোর জালে জড়িয়ে পড়তে পারেন, পরীমনির এই আলোচিত মামলাটি তার একটি ধ্রুপদী ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে আইনি মহলে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত রায় বা নিষ্পত্তি এখনো আদালতের বিচারাধীন রয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে রুপালি পর্দার এই তারকাকে তার পেশাগত অভিনয়ের পাশাপাশি আদালতের বারান্দায় নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলা, বোট ক্লাবের পাল্টা মামলা, একাধিকবার পুলিশের রিমান্ড, কারাভোগ এবং জামিন-সব মিলিয়ে এক অত্যন্ত দুর্বিষহ ও ক্লান্তিকর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান কয়েকটি বছর অতিবাহিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানের ন্যায়বিচারের মাপকাঠিতে এই মামলাটি এখন এক চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, যা ভবিষ্যতে দেশের বিচার ব্যবস্থায় মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে একটি শক্ত ও নিরপেক্ষ আইনি নজির স্থাপন করতে সক্ষম হবে বলে প্রথিতযশা আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।