রোববার, ২১ জুন মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যেকার সম্পর্কের এক নজিরবিহীন অবনতি হিসেবে আখ্যায়িত করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি নিজেই এই সম্মাননা হস্তান্তরের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি জানান, পোল্যান্ডের পক্ষ থেকে তাকে যে ‘অর্ডার অফ দ্য হোয়াইট ঈগল’ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছিল, তা তিনি ইতিমধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে ফেরত পাঠিয়েছেন।
নিজের বক্তব্যের সপক্ষে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই সম্মাননাসূচক পদকের ছবি এবং পোল্যান্ডের রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানো ডাক বিভাগের রসিদও প্রকাশ করেন।
এই পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক আবেগঘন অথচ দৃঢ় বার্তায় জেলেনস্কি লিখেছেন, "ইউক্রেনের আপামর জনসাধারণ গভীরভাবে বিশ্বাস করেছিল যে, এই বিরল সম্মাননাটি মূলত ইউক্রেনের অদম্য জনগণ এবং আমাদের বীর সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রদান করা হয়েছিল।
কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আজ আমি এটি পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের কাছে সসম্মানে ফেরত পাঠিয়েছি। ইউক্রেনীয়রা প্রকৃতপক্ষে কোন সম্মানের যোগ্য, তা একমাত্র ভবিষ্যৎই প্রমাণ করবে।"
মূলত, পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যারল নাভরোৎস্কি সম্প্রতি জেলেনস্কির কাছ থেকে এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আর এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ইউক্রেনের একটি বিশেষ সামরিক ইউনিটের নামকরণের বিষয়টিকে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিয়ে পোল্যান্ডের তীব্র আপত্তি রয়েছে। গত ২৬ মে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট এক বিশেষ ডিক্রি জারির মাধ্যমে দেশটির স্পেশাল অপারেশন ফোর্সেসের একটি ইউনিটের নাম ‘ইউক্রেনিয়ান ইনসার্জেন্ট আর্মি (ইউপিএ)’-এর নামে নামকরণ করেন।
ইতিহাস বলছে, ইউপিএ নামক এই সশস্ত্র সংগঠনটি ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে ওই অঞ্চলে সক্রিয় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বিপুলসংখ্যক পোলিশ নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এই সংগঠনটির বিরুদ্ধে।
পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট নাভরোৎস্কি এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, পোলিশ সমাজের এক বিশাল অংশের কাছে ইউপিএ কোনো সাধারণ সংগঠন নয়, বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পোল্যান্ডের নিরীহ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়ংকর ও নৃশংস অপরাধের জন্য সরাসরি দায়ী।
উল্লেখ্য, মাত্র এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৩ সালে তৎকালীন পোলিশ প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেজ ডুডা ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা, যুদ্ধকালীন দৃঢ়তা এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে ভলোদিমির জেলেনস্কিকে পোল্যান্ডের সর্বোচ্চ এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করেছিলেন।
কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ইতিহাসের এক অমীমাংসিত অধ্যায়কে কেন্দ্র করে সেই সম্মাননা ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা দুই দেশের মধ্যেকার মিত্রতায় এক বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।