২০২৫ সালে উত্তর লন্ডনে সংঘটিত এই নাশকতার ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে লন্ডনের ওল্ড বেইলি আদালত সম্প্রতি দুই ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। দণ্ডিতরা হলেন ২২ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় নাগরিক রোমান লাভরিনোভিচ এবং ২৭ বছর বয়সী ইউক্রেনে জন্ম নেওয়া রোমানীয় নাগরিক স্ট্যানিস্লাভ কার্পিউক।
আদালতের নথি অনুযায়ী, রোমান লাভরিনোভিচকে অনলাইনে ভাড়া করে এই নাশকতা ঘটানো হয়েছিল, যার পেছনে কাজ করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইয়েভজেনি লিউকশিন নামের এক ব্যক্তি।
বিবিসির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, এই পুরো ঘটনাটি ছিল রাশিয়া পরিচালিত একটি বিস্তৃত নাশকতামূলক অভিযানের অংশ। ‘ইএল মানি’ ছদ্মনামে টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগকারী লিউকশিন অনলাইনে অর্থ ও নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে লাভরিনোভিচকে এই হামলার কাজে ব্যবহার করেন।
যদিও তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, লাভরিনোভিচ সম্ভবত জানতেন না যে তিনি প্রকৃতপক্ষে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সম্পত্তি লক্ষ্য করে নাশকতা চালাচ্ছেন। প্রাথমিকভাবে তাকে বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগানো ও গ্রাফিতি আঁকার মতো কাজের দায়িত্ব দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে তাকে অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধে প্রলুব্ধ করা হয়।
লিউকশিনের টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক সংস্থা ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ এবং বিভিন্ন রুশপন্থী প্রচার চ্যানেলের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের মতে, রুশ এজেন্টরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামকে ব্যবহার করে সুদূরপ্রসারী এক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
তারা অনলাইনে ভুয়া উগ্র-ডানপন্থী এবং ইসলাম-বিরোধী গোষ্ঠী তৈরি করে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে টমি রবিনসনের মতো উগ্রপন্থী কর্মীরা প্রচার করেন।
এর মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাজ্যে বিভেদ তৈরি করা, ভীতি ছড়ানো এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা। লিউকশিনের টেলিগ্রাম চ্যানেলে নিয়মিতভাবে প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রশংসা, ইউক্রেনীয়দের প্রতি বিদ্বেষমূলক মন্তব্য এবং নাশকতায় উস্কানিমূলক প্রচারণা চালানো হতো।
এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যে অবস্থিত রুশ দূতাবাস তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এ ধরনের যেকোনো বেআইনি কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগ স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
তাদের ভাষ্যমতে, রাশিয়া কোনোভাবেই যুক্তরাজ্যের জনগণের জন্য হুমকি নয় এবং দেশটির বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসী উদ্দেশ্য তাদের নেই। ইয়েভজেনি লিউকশিন বিবিসির পক্ষ থেকে করা মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেননি।
তবে সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানের পরপরই সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলো অনলাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটি আধুনিক ডিজিটাল যুগে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ ও সাইবার যুদ্ধের এক ভয়াবহ ও বাস্তব উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি করেছে।