এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে চলমান বাণিজ্য সম্পর্কের একটি অনিশ্চিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে বলে প্রবল আশা করছেন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে একটি প্রাথমিক ঐকমত্যে পৌঁছায়।
সেই সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ রপ্তানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর বিপরীতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেদের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করে তা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। তবে চুক্তির পরবর্তী পথটি খুব একটা মসৃণ ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষ, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে সৃষ্ট আকস্মিক উত্তেজনা এবং মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বেশ কিছু শুল্ক বাতিল হয়ে যাওয়ার কারণে এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে থমকে ছিল।
অবশ্য ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলো এই চুক্তিতে নিজেদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিশ্চিত করেছে। এখন কেবল ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের সম্মতি পাওয়া গেলেই চুক্তিটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ধাপটি সফলভাবে সম্পন্ন হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, পার্লামেন্টের অনুমোদনের ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ৪ জুলাইয়ের সময়সীমার আগেই চুক্তির যাবতীয় কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
একইসঙ্গে ইউরোপীয় গাড়ি শিল্পের ওপর নতুন করে মার্কিন শুল্ক আরোপের যে বড় ধরনের হুমকি ছিল, তা সফলভাবে এড়ানো যাবে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বৃহত্তম রাজনৈতিক জোট কনজারভেটিভ ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেইন ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে এই চুক্তির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
পার্লামেন্টের এই চূড়ান্ত অনুমোদনের পর কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক কাজ বাকি থাকবে। আগামী সপ্তাহে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারি গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমেই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
তবে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নিজেদের সুরক্ষার স্বার্থে চুক্তিতে বেশ কিছু কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করেছে। শর্ত অনুযায়ী, চুক্তিটি নতুন করে নবায়ন করা না হলে ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ এর মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে। পাশাপাশি, একটি বিশেষ সুরক্ষামূলক ধারা রাখা হয়েছে।
এই ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয় কিংবা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অন্যায্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তবে ইইউর বাণিজ্য নীতির দায়িত্বে থাকা ইউরোপীয় কমিশনের এই চুক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করার পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।
নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়ে ইউরোপের এই অনড় অবস্থানের কথা তুলে ধরে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্য বিষয়ক কমিটির প্রধান বার্ন্ড ল্যাঙ্গে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইউরোপীয় পার্লামেন্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো শর্তহীন চুক্তি ইউরোপ গ্রহণ করবে না এবং তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।’
তার এই পেশাদার ও বলিষ্ঠ বক্তব্যের মাধ্যমে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুমাত্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনোভাবেই আপস করতে বা নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিন্দুমাত্র হুমকির মুখে ফেলতে রাজি নয়।