ইতালির সিসিলি দ্বীপের সুপরিচিত কাতানিয়া শহরের একটি ভাড়া বাসার ভেতর থেকে জিন্নাত খান খোকন নামের ওই পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তাঁর এমন অকাল ও করুণ মৃত্যুতে ইউরোপের মাটিতে উন্নত জীবনের আশায় অবৈধ বা অনিয়মিত পথে পাড়ি জমানো হাজার হাজার অভিবাসীর দৈনন্দিন মানবেতর জীবনযাপন, পদে পদে আইনি জটিলতা এবং টিকে থাকার এক নিরন্তর মানসিক লড়াইয়ের অত্যন্ত রূঢ় ও অন্ধকার বাস্তবতাই যেন বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে উন্মোচিত হয়েছে।
পারিবারিক পরিচয় ও স্থানীয় সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত জিন্নাত খান খোকন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বাগেরহাট সদর উপজেলার অন্তর্গত শিমুলতলা গ্রামের প্রয়াত লুৎফর রহমান খানের সন্তান।
পরিবারের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আর্থিক দুর্দশা ঘোচানোর এক বুকভরা স্বপ্ন ও আকাশকুসুম আশা নিয়ে প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ টাকার এক বিশাল অঙ্ক ব্যয় করে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি দেশত্যাগ করেছিলেন।
নিহতের শোকসন্তপ্ত পারিবারিক সূত্রগুলো অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে নিশ্চিত করেছে যে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দিতে তাদের মাথা গোঁজার শেষ সম্বল বসতভিটাটি বিক্রি করে দিতে হয়েছিল।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন মহাজন ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে বিশাল অঙ্কের ঋণও গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল দরিদ্র পরিবারটি। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী ও দেশীয় দালালচক্রের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে তিনি শুরুতে ইউরোপের আরেক দেশ বুলগেরিয়ায় গিয়ে পৌঁছান এবং পরবর্তীতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিপদসংকুল ও অনিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম করে ইতালিতে প্রবেশ করতে বাধ্য হন।
কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের দেশ ইতালিতে পৌঁছানোর পর বাস্তবতার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন, কঠিন ও নির্মম রূপের মুখোমুখি হন খোকন। সেখানে পৌঁছানোর পর দীর্ঘ একটি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও তিনি বেঁচে থাকার তাগিদে কোনো স্থায়ী বা সম্মানজনক কাজ পেতে চরমভাবে ব্যর্থ হন।
একই সঙ্গে ইতালির কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে বৈধভাবে বসবাসের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আইনি কাগজপত্র জোগাড় করার কোনো বাস্তব সুযোগও তিনি পাচ্ছিলেন না।
একদিকে দেশে পাওনাদারদের বিপুল ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য পরিবারের ওপর আসা অব্যাহত মানসিক চাপ, অন্যদিকে বিদেশের মাটিতে নিদারুণ বেকারত্ব, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা ও এক ঘোর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-এই সব কিছুর যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তিনি মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত, বিষাদগ্রস্ত ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।
ইতালির স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সেখানে বসবাসরত অন্যান্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রাথমিক ধারণা, এই তীব্র ও অসহনীয় মানসিক চাপ, ভবিষ্যতের প্রতি গভীর হতাশা এবং চরম আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার কারণেই তিনি চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন অবসানের মতো এমন চরম ও মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
এই বিয়োগান্তক ঘটনার খবর পৌঁছানোর পর দেশে রেখে যাওয়া তাঁর পরিবার এখন গভীর শোক, বাকরুদ্ধ অবস্থা ও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছে।
নিহতের স্ত্রী সুমি বেগম অত্যন্ত অশ্রুসিক্ত ও ভগ্ন কণ্ঠে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে জানান, পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানো এবং সন্তানদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার আশায় তাঁর স্বামী জীবনের সবটুকু ঝুঁকি নিয়ে দূর পরবাসে গিয়েছিলেন।
কিন্তু ভাগ্যের এক চরম ও নির্মম পরিহাসে তাদের সেই তিল তিল করে জমানো সাজানো স্বপ্ন আজ এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া পরিবারটি এখন এতটাই তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্যে নিপতিত হয়েছে যে, বিদেশের মাটি থেকে প্রিয়জনের নিথর দেহটুকু দেশে ফিরিয়ে এনে শেষ বিদায় জানানোর মতো ন্যূনতম আর্থিক সামর্থ্য বা সঙ্গতিও আজ আর তাদের অবশিষ্ট নেই।
এমন এক হৃদয়বিদারক, অসহায় ও গভীর মানবিক সংকটের মুখে ইতালির রাজধানী রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব, পেশাদারত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করছে।
দূতাবাসের দায়িত্বশীল ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানানো হয়েছে, ইতোমধ্যে ইতালির স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাস নিবিড়ভাবে যোগাযোগ ও সমন্বয় স্থাপন করেছে।
নিহতের প্রয়োজনীয় আইনি কাগজপত্র ও পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। পুলিশি তদন্তসহ যাবতীয় আইনি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে মরদেহটি বাংলাদেশে তাঁর পরিবারের কাছে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ ইতিমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, দেশে থাকা শোকাহত ও অসহায় পরিবারটির চরম আর্থিক অক্ষমতার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে ও ব্যবস্থাপনায় মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ সরকার।
এর পাশাপাশি সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংরক্ষিত তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে জরুরি আর্থিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট মহলে বর্তমানে সক্রিয়ভাবে আলোচনাধীন রয়েছে বলে দূতাবাসের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
উন্নত জীবনের আশায় দেশান্তরী হওয়া একজন কর্মক্ষম তরুণের এমন মর্মান্তিক ও করুণ পরিণতি ইতালিসহ সমগ্র ইউরোপে বসবাসরত হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এক গভীর শোক, উদ্বেগ ও বিষাদের ছায়া নামিয়ে এনেছে।