বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউক্রেনে যাত্রীবাহী বাসে রাশিয়ার ভয়াবহ বোমা হামলা, নিহত ৩৩

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:১২ পিএম

ইউক্রেনে যাত্রীবাহী বাসে রাশিয়ার ভয়াবহ বোমা হামলা, নিহত ৩৩
ছবি : Collected

পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস প্রদেশের দোনেৎস্ক অঞ্চলে একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক, অমানবিক ও ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। দোনেৎস্কের ক্রামাতোর্সক শহরে সাধারণ যাত্রীবাহী দুটি বাসের ওপর রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর পরিচালিত এক বর্বরোচিত বোমা হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে।

 

এই ভয়াবহ হামলায় আরও অন্তত ১৮ জন নিরীহ যাত্রী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থাই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে স্থানীয় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। ফলে নিহতের সংখ্যা আগামীতে আরও বাড়তে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, উদ্ধারকর্মীদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে এই ভয়াবহ প্রাণহানির তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বিপর্যস্ত একটি অঞ্চলে, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত বাঁচার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন, সেখানে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম যাত্রীবাহী বাসের ওপর এ ধরনের সরাসরি প্রাণঘাতী হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং যুদ্ধনীতির চরম লঙ্ঘন হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

হামলার পরপরই ঘটনাস্থলের যে বীভৎস ও ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে শিউরে ওঠার জন্য যথেষ্ট। স্থানীয় প্রসিকিউটরদের কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বেশ কিছু স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, রাশিয়ার নিক্ষিপ্ত শক্তিশালী ও বিধ্বংসী বোমার ভয়াবহ আঘাতে বাস দুটি সম্পূর্ণভাবে আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে।

 

ধ্বংসপ্রাপ্ত, কঙ্কালসার ও ধোঁয়া ওঠা বাস দুটির চারপাশে যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে হতভাগ্য যাত্রীদের নিথর মৃতদেহ এবং তাদের ছিন্নভিন্ন ব্যবহার্য জিনিসপত্র। চারপাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে স্বজন হারানো মানুষের আর্তনাদ আর বারুদের উৎকট গন্ধে।

 

উদ্ধারকর্মীরা অত্যন্ত বেদনাহত কণ্ঠে জানিয়েছেন, হামলার সময় দুটি বাসেই প্রচুর সংখ্যক সাধারণ যাত্রী উপস্থিত ছিলেন, যারা নিজেদের প্রাত্যহিক প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করছিলেন। দোনেৎস্কের আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধান ভাদইয়াম ফিলাসকিন এই জঘন্য হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অভিযোগ করে বলেন যে, রাশিয়ার সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে এবং সুপরিকল্পিত উপায়ে সাধারণ যাত্রীবাহী বাসের ওপর এই অমানবিক হামলা চালিয়েছে।

 

তাঁর মতে, যত বেশি সম্ভব নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে ইউক্রেনীয়দের মনে চরম আতঙ্ক, ভীতি ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় সৃষ্টি করাই ছিল রুশ সেনাদের এই বর্বরোচিত হামলার মূল উদ্দেশ্য।

 

আন্তর্জাতিক সামরিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, ক্রামাতোর্সক শহরের ওপর সাধারণ বেসামরিক মানুষের লক্ষ্য করে এই ভয়াবহ হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি রাশিয়ার বৃহত্তর সামরিক কৌশলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী অংশ।

 

দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ক্রামাতোর্সক এবং এর পার্শ্ববর্তী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর স্লোভায়ান্সক সম্পূর্ণরূপে নিজেদের সামরিক দখলে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুটি শহর দখল করতে পারলেই রাশিয়ার জন্য পুরো দনবাস অঞ্চলের ওপর নিরঙ্কুশ সামরিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। দনবাসের ভৌগোলিক অবস্থান, খনিজ সম্পদ এবং শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির কারণে এই বিস্তৃত অঞ্চলটি উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

দনবাসের সবচেয়ে বড় দুটি অঞ্চল হলো লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক। এর মধ্যে লুহানস্ক অঞ্চলটি ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে এবং সেখানে মস্কো তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে।

 

অপরদিকে, দোনেৎস্ক অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ ভূখণ্ড বর্তমানে রুশ সেনাদের শক্ত দখলে রয়েছে। অবশিষ্ট যে ২০ শতাংশ ভূখণ্ড এখনো ইউক্রেনীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের রয়েছে, মূলত সেখানেই এখন সম্মুখ সমরে তীব্র লড়াই চলছে এবং রাশিয়া যেকোনো মূল্যে এই বাকি অংশটুকুও নিজেদের মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করতে তাদের সর্বাত্মক সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে।

 

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশদ ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিগত বেশ কয়েকদিন ধরেই ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে সাধারণ বেসামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর রাশিয়ার হামলার মাত্রা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক ঘাঁটির পরিবর্তে সাধারণ মানুষের আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার এবং যাতায়াতের মাধ্যমগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার একটি ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

এরই ধারাবাহিকতায় ক্রামাতোর্সকের এই যাত্রীবাহী বাসে বোমাবর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা সংঘটিত হলো। চলমান এই যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানির পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হৃদয়বিদারক।

 

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংঘাতের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, বিগত ২০২৫ সালের পুরো বছরজুড়ে ইউক্রেনে যত সংখ্যক সাধারণ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিলেন, বর্তমান ২০২৬ সালের কেবল আগস্ট মাস পর্যন্ত তার চেয়েও অনেক বেশি নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

 

এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, চলমান এই সামরিক সংঘাত সাধারণ মানুষের জন্য প্রতিদিন কতটা প্রাণঘাতী, নিরাপত্তাহীন এবং ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস অঞ্চলের এই দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের একটি অত্যন্ত গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও জনতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।

 

দনবাস অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবেই রুশ ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের ওপর পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি ছিল এই দনবাস অঞ্চলকে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন করা।

 

রাশিয়ার পক্ষ থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বারবার এই গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে যে, ইউক্রেনীয় সরকার এবং তাদের সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দনবাস অঞ্চলের রুশ ভাষাভাষী সাধারণ মানুষের ওপর চরম অমানবিক নির্যাতন, জাতিগত নিপীড়ন ও পদ্ধতিগত বৈষম্য চালিয়ে আসছে।

 

মূলত এই বৃহত্তর রুশ ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে ইউক্রেনীয়দের কথিত নির্যাতন থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করা এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সামনে রেখেই পরবর্তীতে ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন চালানোর অন্যতম প্রধান যৌক্তিক কারণ হিসেবে মস্কো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছিল।

 

যদিও ইউক্রেন এবং পশ্চিমা বিশ্ব শুরু থেকেই রাশিয়ার এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র দখলের নিছক সাম্রাজ্যবাদী অজুহাত হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

 

সাধারণ যাত্রীবাহী বাসে এমন ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী বোমা হামলার পর ইউক্রেনসহ সমগ্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠলেও, এখন পর্যন্ত রাশিয়ার সরকারি পর্যায় থেকে বা মস্কোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট হামলার বিষয়ে কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

 

রাশিয়া সাধারণত বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে থাকে যে তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানছে; তবে ক্রামাতোর্সকের এই মর্মান্তিক ঘটনা ময়দানের বাস্তবতার এক ভিন্ন ও নির্মম চিত্রই তুলে ধরেছে।

 

এটি আবারও প্রমাণ করেছে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা বর্তমানে কতটা চরম হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস এবং উদ্ধারকর্মীরা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে হতাহতদের দ্রুত উদ্ধার করতে।

 

আহতদের স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তবে যুদ্ধাহত মানুষের চাপে এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের অভাবে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। ইউক্রেন যুদ্ধের এই দীর্ঘস্থায়ী, ক্লান্তিকর ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ে সাধারণ মানুষের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত জোরালো ও স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।

 

দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অর্থহীন সংঘাতের একটি কার্যকর কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা না গেলে, আগামী দিনগুলোতে এ ধরনের মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ, ব্যাপক ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নিরপরাধ মানুষের রক্তে রঞ্জিত ক্রামাতোর্সকের রাজপথ আজ যেন সমগ্র বিশ্ববিবেকের কাছে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও স্থায়ী শান্তির এক বোবা আর্তনাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- বিবিসি