আজ মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের চিত্র ছিল অন্যান্য সাধারণ দিনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উত্তাল। এদিন দেশজুড়ে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী, তাদের শিক্ষক সমাজ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা রাজপথে নেমে এসে এক বিশাল ও সর্বাত্মক বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের বিরুদ্ধে গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ নীরবে দানা বাঁধছিল, তা আজ এক ভয়াবহ ও গণ-আন্দোলনের রূপ ধারণ করেছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এখন আর কেবল একটি সাধারণ প্রতিবাদ নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক অবহেলার বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিরোধ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই তীব্র ও দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে মূলত বেশ কয়েকটি দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর সমস্যা। প্রথমত, দেশটির সরকারি ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের তীব্র অভাব রয়েছে, যার ফলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার স্বাভাবিক ও সুস্থ পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনের তুলনায় যোগ্য শিক্ষকের সংখ্যা এতটাই অপ্রতুল যে, অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বোপরি, বর্তমান সরকারের শিক্ষাখাতে অর্থায়ন বা বাজেট ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়ার যে নতুন ও বিতর্কিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা যেন এই চলমান সংকটে জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে শিক্ষার মতো একটি মৌলিক ও মানবাধিকারের জন্য সর্বাধিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করবে, সেখানে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে উল্টো বাজেট সংকোচন করা হচ্ছে।
এই হঠকারী ও একপেশে সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই মূলত গত দুই সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রান্তে একটু একটু করে এই আন্দোলন গড়ে উঠেছে। আর আজ সেই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, যখন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা একযোগে দেশের শত শত স্কুল সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয় এবং দেশব্যাপী শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি অচল করে দেয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ সকালের দিকে ফ্রান্সের মার্সেই, নাঁতেস এবং লিওঁ শহরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান নগরীগুলোতে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে এই বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়।
সকাল থেকেই এসব শহরের প্রধান রাজপথ ও গুরুত্বপূর্ণ চত্বরগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে। তবে সকলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এখন রাজধানী প্যারিসের দিকে নিবন্ধিত, কারণ বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা অনুযায়ী, দুপুরের পর রাজধানী প্যারিসেই সবচেয়ে বড়, ঐতিহাসিক ও সবচেয়ে প্রভাবশালী বিক্ষোভ সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
আন্দোলনরত এই তরুণ শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে থাকা বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্রচারপত্র ও ব্যানারগুলো তাদের মনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার বাস্তব চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরছে। এরকমই কয়েকটি ব্যানারে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক অথচ জোরালো ভাষায় লেখা ছিল, “আমাদের রাজনীতিবিদরা কোথায়?
তারা কি জানে আমাদের অস্তিত্ব আছে?” এই একটি মাত্র আবেগঘন বাক্যই প্রমাণ করে যে, দেশের তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের কতটা অবহেলিত, উপেক্ষিত এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে মূল্যহীন বলে মনে করছে। তারা গভীরভাবে অনুভব করছে যে, রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা তাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ ও সুরক্ষার বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন।
যে যৌক্তিক আন্দোলন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কেন এমন সহিংসতায় রূপ নিল, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে চারদিকে বিস্তর সমালোচনা হচ্ছে।
যখন এই আন্দোলন একেবারে প্রাথমিক ও গঠনমূলক পর্যায়ে ছিল, তখন পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে কোনো ধরনের আলোচনার পথে না গিয়ে উল্টো শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং ব্যাপক হারে গণগ্রেপ্তার অভিযান চালায়।
পুলিশের এই অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়নের ফলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দাবানলের মতো তা সমগ্র ফ্রান্সে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ফ্রান্স সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের এই অধিকার আদায়ের আন্দোলন এখন আর কোনোভাবেই শান্তিপূর্ণ সীমানার মধ্যে নেই, বরং তা এখন পুরোপুরি ‘শহুরে সহিংসতায়’ রূপ নিয়েছে। সরকারের এই ধরনের একপাক্ষিক মন্তব্য আন্দোলনকারীদের আরও বেশি ক্ষুব্ধ ও জেদি করে তুলেছে।
এই চলমান ও ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভের মধ্যেই গতকাল সোমবার উত্তর ফ্রান্সে এক অত্যন্ত মর্মান্তিক, অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, যা সমগ্র ফ্রান্সকে গভীরভাবে শোকাহত ও একইসঙ্গে চরম ক্ষুব্ধ করেছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মাত্র ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর শিক্ষার্থীর একটি হাত পুলিশের সাথে সংঘর্ষ চলাকালীন এক বিস্ফোরণে সম্পূর্ণ উড়ে গেছে। স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রাথমিক তথ্যমতে, উত্তর ফ্রান্সের ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মতো বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত আন্দোলনকারী পুলিশের সাথে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন শক্ত বস্তু, ইট-পাটকেল ছুঁড়ছিল।
তবে ওই কিশোর শিক্ষার্থীর হাত ঠিক কীভাবে উড়ে গেল বা বিস্ফোরণের প্রকৃত উৎস কী ছিল, সে বিষয়ে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্টভাবে কোনো কিছু নিশ্চিত করতে পারেননি। অন্যদিকে, ফ্রান্সের স্থানীয় ও আঞ্চলিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘লা ভয়েক্স নর্ড’ অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও ভয়ংকর একটি তথ্য প্রকাশ করেছে।
তাদের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ১৫ বছর বয়সী কিশোর শিক্ষার্থী নিজের হাতে পুলিশের ছোঁড়া একটি বিস্ফোরক বা গ্রেনেড তুলে নিয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যেই সেই শক্তিশালী বিস্ফোরকটি বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলে ওই শিক্ষার্থীর একটি হাত এবং শরীরের নিচের অংশের বেশ কিছু জায়গা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চিরতরে উড়ে যায়।
এই অমানবিক, মর্মান্তিক ও রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদের তুমুল ঝড় উঠেছে। এই ব্যাপক ও দেশব্যাপী বিস্তৃত আন্দোলনের ফলে ফ্রান্সের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা এখন প্রায় স্থবির ও পঙ্গু হয়ে পড়েছে। দেশটির হাইস্কুল স্টুডেন্টস ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানানো হয়েছে যে, দেশজুড়ে ১৮০০-এর অধিক স্কুল এখন শিক্ষার্থীদের কঠোর অবরোধের মুখে রয়েছে এবং সেখানে প্রবেশের কোনো উপায় নেই।
এই বিপুল সংখ্যক স্কুল সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ থাকার কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। উদ্ভূত এই জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং শিক্ষাবর্ষ যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য বেশ কিছু স্কুল বাধ্য হয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বা অনলাইনে বিকল্প পাঠদান কার্যক্রম চালানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি ক্রমশ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকুরমু অবশেষে কিছুটা নমনীয় ও আপসকারী অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি বর্তমান সংকট নিরসনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়াগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে তা দ্রুত মেনে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রতি বিশেষ ও জরুরি নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের পেছনে থাকা দাবিগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট, যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, যেসব শিক্ষক বিনা কারণে বা নিয়মিতভাবে শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকেন এবং পাঠদানে অবহেলা করেন, তাদেরকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে বাদ দিতে হবে এবং সেখানে নতুন ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
এছাড়া, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘসময় ধরে একটানা ক্লাস চলার যে অমানবিক ও ক্লান্তিকর নিয়ম চালু আছে, তা দ্রুত পর্যালোচনা করে সময়সূচি শিথিল করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার গ্রহণ এবং মানসিক বিশ্রামের জন্য আরও বেশি সময় বরাদ্দ করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও কাঠামোগত দাবির মধ্যে রয়েছে, দেশের পুরোনো, জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্কুল ভবনগুলো অবিলম্বে সরকারিভাবে পর্যবেক্ষণ করে সেগুলো সংস্কার বা আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষাখাতে বাজেট কমানোর জন্য সরকার যে আত্মঘাতী ও নেতিবাচক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, তা থেকে অবিলম্বে এবং শর্তহীনভাবে সরে আসতে হবে। এই মৌলিক দাবিগুলো সম্পূর্ণরূপে পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থী রাজপথ ছাড়বে না এবং অবরোধ তুলে নেবে না বলে তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। এখন কেবল অপেক্ষার বিষয়, পরিস্থিতি শান্ত করতে সরকার কত দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করে।