একদিকে আকাশচুম্বী দামের কারণে এশিয়া মহাদেশের দেশগুলো তাদের জ্বালানি কেনাকাটা বাধ্য হয়ে কমিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে আসন্ন শীত মৌসুমকে সামনে রেখে ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে বাধ্য হয়ে চরম উচ্চমূল্যেই এলএনজি সংগ্রহ ও মজুত করতে শুরু করেছে।
এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে এক গভীর ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি খুব দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আগামী দিনগুলোতে এটি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
পণ্যবাজারের অত্যন্ত সুপরিচিত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের সাম্প্রতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে চলমান এই সংকটের প্রকৃত গভীরতা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়।
সংস্থাটির দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এশিয়া মহাদেশে এলএনজি আমদানির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে প্রায় বিশ মিলিয়ন বা দুই কোটি টনে নেমে আসতে পারে।
অথচ গত বছরের ঠিক এই সময়ে কিংবা মাত্র এক মাস আগেও এই আমদানির পরিমাণ ছিল অন্তত বাইশ মিলিয়ন টন। স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এই অস্বাভাবিক, আকস্মিক ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এশীয় ক্রেতাদের ওপর।
উচ্চমূল্যের এই প্রচণ্ড চাপের কারণে চলতি বছরের বাকি সময়টিতেও এশিয়ার বাজারে এলএনজির সার্বিক চাহিদা নিম্নমুখী থাকার একটি জোরালো পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মূলত এশিয়ার অনেক উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক নাজুক ও ভঙ্গুর অবস্থানে রয়েছে যেখানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এত চড়া দামে জ্বালানি কিনে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার ভয়ে অনেক দেশই স্পট মার্কেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার একটি বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশের অর্থনীতি মূলত আমদানিনির্ভর, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে, এশিয়ার ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ইউরোপ মহাদেশে। আসন্ন শীতের তীব্রতা এবং নাগরিকদের উষ্ণ রাখার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ইউরোপ বর্তমানে চরম চাপের মুখে পড়েছে। বাধ্য হয়ে তারা আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে হলেও যেকোনো মূল্যে এলএনজি মজুত করার দিকে সর্বাত্মক মনোযোগ দিয়েছে।
চলতি মাসে মহাদেশটি প্রায় আট মিলিয়ন টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করলেও, আগামী অক্টোবর মাস নাগাদ এর চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে দশ মিলিয়ন টনে গিয়ে দাঁড়াবে বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছর সব মিলিয়ে ইউরোপের দেশগুলোকে প্রায় একশো পঁচিশ মিলিয়ন টন পর্যন্ত এলএনজি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিনতে হতে পারে। ইউরোপের এই মরিয়া হয়ে ওঠার পেছনে মূলত ভূ-রাজনৈতিক কারণই সবচেয়ে বেশি দায়ী।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে চলমান তীব্র সংকট বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এক বিশাল ধস নামিয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ এলএনজি উৎপাদক ও সরবরাহকারী দেশ কাতার থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় এই সংকট আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে। এর পাশাপাশি গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, তার সরাসরি ও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানির বাজারে।
সেই সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় একশো পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপমুখী রাশিয়ার প্রধান গ্যাস পাইপলাইনগুলোও বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে।
ফলে সুলভ মূল্যে গ্যাস পাওয়ার আর কোনো বিকল্প পথ খোলা না থাকায় বাধ্য হয়েই চরম চড়া দামে গ্যাস মজুত করতে হচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলোকে। ইউরোপের জন্য অবশ্য এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়।
এর আগে ২০২২ সালে যখন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়, তখনও ইউরোপীয় দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তার কথা ভেবে চরম চড়া দামে গ্যাস কিনে মজুত করেছিল। তবে সেই সময়ে এক ভিন্ন ধরনের বাস্তবতা বিরাজমান ছিল।
পরবর্তীতে শীতের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এবং গ্যাসের চাহিদা অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যাওয়ায় বিশাল আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছিল বিভিন্ন ইউরোপীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান। তবে তৎকালীন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে রুশ পাইপলাইন আংশিক সচল থাকলেও, এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বর্তমানে রাশিয়ার সাথে ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক প্রায় ছিন্ন হয়ে গেছে বললেই চলে। তাই এবার আর কোনো বিকল্প না থাকায় এবং অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও ইউরোপীয় সরকারগুলো নিজেদের নাগরিকদের শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচাতে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা যেকোনো মূল্যে মজুত বাড়াতে বদ্ধপরিকর। ইউরোপীয় দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখা এবং তীব্র শীতে মানবিক বিপর্যয় রোধ করা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি।
তাই ভবিষ্যতের যেকোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি এড়াতে তারা বর্তমানের এই বিশাল আর্থিক ব্যয় নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন। এদিকে, বিশ্বজুড়ে চলমান এই তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত কৌশলী ও দূরদর্শী অবস্থান গ্রহণ করেছে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন।
আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা এড়াতে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পথে হেঁটেছে। তাৎক্ষণিক বাজারের ওপর নির্ভর না করে আগে থেকেই সরবরাহকারীদের সাথে স্থায়ী চুক্তি করে রাখায় চীনকে বর্তমানের এই আকাশচুম্বী দামের সরাসরি শিকার হতে হচ্ছে না।
শুধু তাই নয়, চীন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রাশিয়া থেকে স্থলপথে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রেখেছে। এর মাধ্যমে কাতারি সরবরাহের কারণে যে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা খুব সহজেই পূরণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বেইজিং।
চীনের মতো আর্থিক সক্ষমতা ও কৌশলগত সুবিধা না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছে বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলো। যেসব দেশ আন্তর্জাতিক বাজারের এই চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কিনতে পারছে না, তারা বাধ্য হয়ে বিকল্প শক্তির সন্ধান করছে।
এলএনজি আমদানিতে অক্ষম হয়ে এই দেশগুলো পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হওয়া সত্ত্বেও তুলনামূলক সস্তা বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নিজেদের নির্ভরতা প্রতিনিয়ত বাড়াচ্ছে।
এর ফলে একদিকে যেমন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার লক্ষ্যমাত্রাগুলো চরম হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে তেমনি এই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিবেশগত ভারসাম্যও দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। তবুও বর্তমানের তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সামাল দিতে এছাড়া তাদের সামনে আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই।
এই সার্বিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলো। বিশেষ করে কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর জ্বালানি খাতে এক অশনিসংকেত দেখা দিয়েছে।
এই দেশগুলোর অর্থনীতি মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম এভাবে লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকলে এই দেশগুলোতে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে ভারী কলকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির মতো চরম অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। তাই এই দেশগুলোর সরকারকে এখন থেকেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে, নতুবা অচিরেই এক গভীর বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।