মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে পুতিনের দলের ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় ভূমিধস বিজয়

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫০ পিএম

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে পুতিনের দলের ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় ভূমিধস বিজয়
ছবি : Collected

রাশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা হলো। সদ্য সমাপ্ত পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ বা স্টেট দুমার নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ‘ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি’ এক ঐতিহাসিক এবং ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে।

 

রাশিয়ার জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা পূর্ণাঙ্গ ফলাফল থেকে এই অভাবনীয় সাফল্যের চিত্রটি উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, কারণ এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলমান রয়েছে।

 

স্টেট দুমার মোট ৪৫০টি আসনের মধ্যে ৩৫৫টিতেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেছেন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির প্রার্থীরা। এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট পুতিনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে আরও একবার পাকাপোক্ত করল।

 

রাশিয়ার নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিন দিন ধরে স্টেট দুমার এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

 

ভোট গণনার সার্বিক প্রক্রিয়া শেষে গতকাল ২১ সেপ্টেম্বর জাতীয় নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ঘোষণা করে। প্রকাশিত ফলাফল এবং পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, এবারের নির্বাচনে রাশিয়ার মোট নিবন্ধিত ভোটারের ৫৯ দশমিক ৩২ শতাংশ নাগরিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

 

প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হিসাব অনুযায়ী, মোট গণনাকৃত ভোটের ৫৮ শতাংশেরও বেশি নিজেদের ঝুলিতে ভরতে সক্ষম হয়েছে ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি। বিপুল ভোটারের উপস্থিতি এবং ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে এই বিশাল জনসমর্থন রাশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির এই বিজয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক আধিপত্যেরই ধারাবাহিকতা।

 

২০০১ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রথমবার জয়ের মাধ্যমে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এই দলটির যে নিরঙ্কুশ শাসনকাঠামোর সূচনা হয়েছিল, তা আজ টানা পঁচিশ বছর ধরে স্টেট দুমায় দাপটের সঙ্গে বিরাজমান রয়েছে। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী রাশিয়ায় প্রতি পাঁচ বছর পর পর স্টেট দুমার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

 

সদ্য সমাপ্ত এই নির্বাচনের আগে গত পঁচিশ বছরে দেশটিতে আরও অন্তত চারটি পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং বিস্ময়করভাবে তার প্রতিটি নির্বাচনেই পরম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়েছে প্রেসিডেন্ট পুতিনের এই রাজনৈতিক দল।

 

তবে এবারের নির্বাচনে দলটির এত বড় আকারের ঐতিহাসিক বিজয় রাশিয়ার রাজনীতিতে এবারই প্রথম, যা দলটির জনপ্রিয়তার নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। এই নির্বাচনের ফলাফলকে কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।

 

কাতারভিত্তিক প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার মস্কো প্রতিনিধি দিমিত্রি মেদভেদেঙ্কো এই নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।

 

তিনি মনে করেন, নির্বাচনে প্রায় ষাট শতাংশ ভোটারের এই বিপুল অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতাসীন দলের ঐতিহাসিক বিজয়কে মস্কোর শীর্ষ নেতৃত্ব সম্ভবত তাদের চলমান রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের প্রতি সাধারণ জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন হিসেবেই বিবেচনা করবে।

 

বিশেষ করে ইউক্রেনে চলমান সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ক্রেমলিনের যে অনড় অবস্থান রয়েছে, এই বিজয় সেই পদক্ষেপের প্রতি রুশ নাগরিকদের জনসমর্থন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থানকে জোরালো করার ইঙ্গিত হিসেবেই ব্যবহৃত হবে।

 

এর আগে দুমার সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালে। আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। ফলে যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় এটিই ছিল রাশিয়ার প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন।

 

ক্ষমতাসীন দল নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করলেও, নির্বাচনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। রাশিয়ার জাতীয় নির্বাচন কমিশনের চেয়ারপারসন এল্লা পামফিলোভার দেওয়া আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে ক্ষমতাসীনদের ঠিক পরেই দ্বিতীয় স্থানে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি।

 

বামপন্থি আদর্শের এই রাজনৈতিক দলটি দেশজুড়ে মোট প্রদত্ত ভোটের ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ নিজেদের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়েছে এবং স্টেট দুমার ৪০টি আসনে সরাসরি জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার রাজনীতিতে পরিচিত নাম জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ‘এলডিপিআর’ এবারের নির্বাচনে ২৫টি আসনে জয়লাভ করে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব প্রমাণ করেছে।

 

পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ‘নিউ পিপল পার্টি’ও চমক দেখিয়েছে এবং তারা স্টেট দুমার ২০টি আসনে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করেছে। এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর চরম বিপর্যয়।

 

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান সশস্ত্র সংঘাতের প্রকাশ্য বিরোধিতাকারী একমাত্র রাজনৈতিক দল ‘ইয়াবোলোকো’ এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দলটির প্রার্থীরা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো সত্ত্বেও স্টেট দুমার একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেননি।

 

যুদ্ধবিরোধী প্রচারণাকে মূল হাতিয়ার করে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আদায়ের যে চেষ্টা দলটি করেছিল, তা ভোটের মাঠে পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়ার বর্তমান কঠোর রাজনৈতিক পরিবেশে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করা প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার।

 

জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ইস্যুটি রুশ সমাজে এতটাই প্রবল যে সেখানে যুদ্ধবিরোধী দলগুলোর জনসমর্থন আদায় করা অত্যন্ত কঠিন। পার্লামেন্ট নির্বাচনের এই একপেশে ফলাফলে বহির্বিশ্ব কিছুটা কৌতূহলী হলেও, সাধারণ রুশ নাগরিকদের মধ্যে এ নিয়ে খুব একটা বিস্ময় দেখা যায়নি। রাশিয়ার সাধারণ মানুষ এবং ভোটাররা নির্বাচনের এই ফলাফলে একেবারেই অবাক হননি।

 

তাদের সুস্পষ্ট অভিমত হলো, বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রবল প্রভাবের কারণে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল যে ঠিক এমনটাই হবে, তা আগে থেকেই প্রত্যাশিত ছিল।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার সঙ্গে একান্ত আলাপকালে রাজধানী মস্কোর বাসিন্দা তাতিয়ানা সাধারণ মানুষের এই নির্লিপ্ত মনস্তত্ত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের পরদিন সকালে টেলিভিশন চালু করতেই তিনি দেখতে পান যে প্রেসিডেন্ট পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি আবারও বিশাল ব্যবধানে নির্বাচনে জিততে চলেছে।

 

এই খবর দেখে তিনি বিন্দুমাত্র অবাক হননি এবং তার দৃঢ় বিশ্বাস যে, রাশিয়ার কেউই এই প্রত্যাশিত ফলাফলে তেমন কোনো বিস্ময় প্রকাশ করেননি। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এবং চলমান সংকটের বিষয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কী, এমন প্রশ্নের জবাবে উঠে এসেছে শান্তির চিরায়ত আকাঙ্ক্ষার কথা।

 

সামনে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতিতে বা সমাজে কোনো ধরনের পরিবর্তন দেখতে চান কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে মস্কোর বাসিন্দা তাতিয়ানা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি উত্তর প্রদান করেন। তিনি নির্দ্বিধায় বলেন, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে তাদের দেশের মূল সংকটটি কোথায়, তা তারা সবাই খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন।

 

আর সেই প্রধান সংকটটি হলো ইউক্রেনের মাটিতে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনি মনেপ্রাণে প্রত্যাশা করেন যে, যদি কোনোভাবে সুযোগ তৈরি হয়, তবে শান্তিপূর্ণ উপায়ের মাধ্যমে যেন যত দ্রুত সম্ভব এই সংঘাতের অবসান ঘটানো হয়।

 

সাধারণ মানুষের এই শান্তিকামী মানসিকতা নির্বাচনের ফলাফলে সরাসরি প্রতিফলিত না হলেও, সমাজের একটি বড় অংশের অন্তরে যে শান্তির আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে আছে, তা এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই উন্মোচিত হয়েছে।

 

- আলজাজিরা