রাজধানী মস্কোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ধারাবাহিক আক্রমণ সত্ত্বেও ভোট গ্রহণ শেষে প্রাথমিক ফলাফলে ক্ষমতাসীন দলটির সুস্পষ্ট প্রাধান্য দৃশ্যমান হয়েছে। যদিও রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন এখনও আনুষ্ঠানিক বা চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেনি, তবে বিভিন্ন নির্বাচনী সূত্র ও বেসরকারি পরিসংখ্যানে দলটির একচ্ছত্র আধিপত্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।
নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বেসরকারি পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রাথমিক গণনা অনুযায়ী, ইতিমধ্যে গণনাকৃত ভোটের প্রায় ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ পেয়ে নিরঙ্কুশ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি। স্টেট দুমার মোট আসনসংখ্যা ৪৫০টি।
প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ আসনেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চেয়েছিল ক্রেমলিন, যা ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার সমান্তরালে তীব্র সামরিক সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে রাশিয়ার কেন্দ্রস্থলে। ভোট গ্রহণ চলাকালে গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাত থেকে ২০ সেপ্টেম্বর ভোর পর্যন্ত মস্কো লক্ষ্য করে স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ ড্রোন অভিযান পরিচালনা করে ইউক্রেনীয় বাহিনী।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, স্টেট দুমার মোট আসনসংখ্যার সঙ্গে প্রতীকী মিল রেখে মস্কো অভিমুখে অন্তত ৪৫০টি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছিল। দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ড্রোনকে ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও কয়েকটি ড্রোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানতে সমর্থ হয়।
রাজধানী মস্কোর অভ্যন্তরে সেসব ড্রোনের আঘাতে অন্তত দুজন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। প্রতিরক্ষা দপ্তর আরও বিস্তারিত প্রকাশ করে জানায়, ১৯ সেপ্টেম্বর রাত থেকে ২০ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত রাজধানী মস্কো এবং অন্যান্য সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে ইউক্রেন প্রায় দুই হাজার চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন এবং আটটি দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রেখে সব কটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং সিংহভাগ ড্রোন ধ্বংস করা হয় বলে মস্কো দাবি করেছে। কেবল আকাশপথের আক্রমণেই এই সংঘাত সীমাবদ্ধ ছিল না; ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর বড় আকারের সাইবার হামলা চালায় ইউক্রেনীয় হ্যাকাররা।
রাশিয়ার নির্বাচনী ডিজিটাল ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব সমন্বিত সাইবার আক্রমণ চালানো হলেও কর্তৃপক্ষ সফলভাবে তা প্রতিহত করে বলে দাবি করে নির্বাচন কমিশন। ফলে কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয় ছাড়াই ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়।
এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান এল্লা পামফিলোভা এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বহিরাগত শক্তি যত বেশি চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করবে, সাধারণ রুশ নাগরিকরা তত বেশি সংহত ও ঐক্যবদ্ধ হবে।
এই হামলা রাশিয়ার জনগণের জাতীয় সংহতিকে বরং আরও সুদৃঢ় করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সুরে রাশিয়ার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ মন্তব্য করেছেন, ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির এই নির্বাচনী সাফল্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ।
তাঁর মতে, এ ফলাফল প্রমাণ করে যে দেশের সাধারণ মানুষ দলের বর্তমান নেতৃত্বের ওপর গভীরভাবে আস্থাশীল এবং তারা চান এই দলই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাক।
চার বছর আগে প্রতিবেশী ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এই প্রথম দেশটিতে স্টেট দুমার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ফলে এই নির্বাচনকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।
তবে এই নির্বাচনের সামগ্রিক আবহ ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, যেসব রাজনৈতিক দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী সরাসরি চলমান সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের অধিকাংশকেই নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
রাশিয়ার প্রধান বিরোধী ও উদারপন্থি রাজনৈতিক দল ‘ইয়াবলোকো’র কয়েকজন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেলেও তারা প্রচারণায় চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আইনি বাধার কথা তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যে যুদ্ধক্লান্তি বা অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, সেটিকে কাজে লাগিয়ে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন এই প্রার্থীরা।
তবে দলটির শীর্ষ নেতাদের ওপর রাষ্ট্রীয় কঠোর অবস্থানের কারণে সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সীমিত। উল্লেখ্য, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই চলমান যুদ্ধের সমালোচনামূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে দলটির দুজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে আদালত দীর্ঘমেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করে। ফলে বড় কোনো প্রকাশ্য বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই যুদ্ধকালীন জাতীয়তাবাদের আবহে পুতিনের দল পুনরায় পার্লামেন্টে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে।