মঙ্গলবার রাজধানী সারাজেভোতে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলমেদিন কোনাকোভিচ প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া এই কঠোর পদক্ষেপের কথা প্রকাশ করেন।
মূলত বসনিয়ার কসাইখ্যাত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যুর পর সার্বিয়ান শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিতর্কিত প্রতিক্রিয়া ও তাকে সামাজিকভাবে মহিমান্বিত করার অব্যাহত অপচেষ্টার জেরেই এই চরম কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলমেদিন কোনাকোভিচ জানান, সারাজেভোতে অবস্থিত সার্বিয়ান দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাশে মিলান দুলানোভিচ এবং সার্বিয়ার নিরাপত্তা তথ্য সংস্থার একজন প্রতিনিধির উপদেষ্টা দারকো মাকসিমোভিচকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।
অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, "এই দুই ব্যক্তিকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড ত্যাগ করার জন্য মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।" তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, তাদের কূটনৈতিক পরিচয়পত্র এবং আনুষঙ্গিক সব সুযোগ-সুবিধা অবিলম্বে বাতিল করা হবে।
পাশাপাশি বসনিয়ায় অবস্থানরত অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের প্রতিও তিনি জোরালো আহ্বান জানান যেন তারা এই দুই সার্বিয়ান কর্মকর্তার সঙ্গে সব ধরনের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ ছিন্ন করেন।
এই নজিরবিহীন কূটনৈতিক পদক্ষেপের পেছনের মূল কারণ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিচের দাফনের পর সার্বিয়ান কর্মকর্তাদের উসকানিমূলক প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন।
এই ধরনের ঘটনাকে তিনি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সব লাল দাগ অতিক্রম করার শামিল বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা কোনোভাবেই গণহত্যা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ঘৃণ্য ব্যক্তিদের মহিমান্বিত করার বিষয়টিকে নিছক কয়েকজন ব্যক্তির স্বাধীন মতামত হিসেবে মেনে নেবে না।
সার্বিয়ার বর্তমান আচরণের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, "অন্য কোনো কিছুই এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। সার্বিয়া বর্তমানে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় যে ধরনের উসকানিমূলক আচরণ করছে, তার চেয়ে কোনো অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামাজিক বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বড় হতে পারে না।"
কূটনীতিকদের বহিষ্কারের পাশাপাশি সারাজেভো আঞ্চলিক কূটনীতিতেও একটি বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনাকোভিচ ঘোষণা করেন যে, আগামী ১ অক্টোবর মন্টিনিগ্রোতে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক ও আঞ্চলিক সহযোগিতাবিষয়ক যে যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল, বসনিয়া তা থেকে নিজেদের সম্মতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, সার্বিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা কোনোভাবেই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না। তার ভাষায়, "সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমরা নব্বইয়ের দশকের সেই পুরোনো উগ্র সার্বিয়াকে দেখতে পাচ্ছি, যা আমাদের গভীরভাবে সতর্ক করছে যে পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক নয়।
এমন অস্থিতিশীল পরিবেশে আমরা এ ধরনের ফাঁকা কাগজের ঘোষণাপত্রে কিছুতেই স্বাক্ষর করব না।" তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার এই সিদ্ধান্তের কথা ইতিমধ্যে মন্টিনিগ্রো সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করেন যে, মূল নথির বিষয়ে বসনিয়ার নিজস্ব কোনো আপত্তি নেই, বরং সার্বিয়ার বর্তমান উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড ও আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তারা এই কঠিন অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে।
এছাড়া সারাজেভোতে সার্বিয়ান দূতাবাসের কর্মী কাঠামো এবং তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঠিক কতজন কূটনৈতিক কর্মীর প্রয়োজন, তা নতুন করে কঠোরভাবে পর্যালোচনা করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ আইনি নিয়ম অনুযায়ী সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে অবস্থিত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার নিজস্ব দূতাবাসের জনবল পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার এবং কনস্যুলার এখতিয়ারে পরিবর্তন আনার বিষয়টিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
সার্বিয়ার রাজনীতিকদের প্রতি একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়ে কোনাকোভিচ বলেন, "যতক্ষণ না পর্যন্ত আপস ও চুক্তির জন্য প্রস্তুত স্বাভাবিক ও সুস্থ মানসিকতার রাজনীতিবিদদের আবির্ভাব ঘটছে, ততক্ষণ আমরা কোনো ছাড় দেব না।
ইতিহাসের সব বিষয়ে আমাদের একমত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, তবে আপনারা আর কখনোই আমাদের এভাবে অপমান ও অপদস্থ করতে পারবেন না।" উল্লেখ্য, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিচকে বিশ্ববাসী 'বসনিয়ার কসাই' হিসেবেই বেশি চেনে।
১৯৯৫ সালের ভয়াবহ স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যাসহ ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরের একটি সুরক্ষিত কারাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগরত অবস্থায় গত ২৭ আগস্ট তার মৃত্যু হয়।
তার মৃত্যুর পর সার্বিয়ার একাংশের উগ্র প্রতিক্রিয়া এবং তাকে জাতীয় বীর হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টাই মূলত বলকান অঞ্চলের এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নতুন করে গুরুতর কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে, যা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।