দীর্ঘ এই ভাসমান অবস্থায় নৌযানটিতে থাকা অন্তত আশি জন হতভাগ্য অভিবাসনপ্রত্যাশীর অনাহারে বা সলিলসমাধিতে মৃত্যু হয়েছে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে একটি স্প্যানিশ বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা।
ভয়ংকর এই সমুদ্রযাত্রার মর্মান্তিক পরিণতি বিশ্বজুড়ে চলমান অভিবাসন সংকটের এক করুণ চিত্র নতুন করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার উপকূল থেকে গত সাতই আগস্ট ছোট আকারের ওই ইঞ্জিনচালিত নৌযানটি স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে এক অনিশ্চিত যাত্রা শুরু করেছিল।
ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী নিয়ে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ পাড়ি দেওয়ার দুঃসাহসিক এই যাত্রায় নৌযানটি মাঝপথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে আটলান্টিকের বুকে ভাসতে থাকে। স্পেনের সুপরিচিত মানবাধিকার সংস্থা ‘ক্যামিনান্দো ফ্রন্টেরাস’-এর পক্ষ থেকে নৌযানটি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে প্রথম সতর্কবার্তা জারি করা হয়।
তাদের সেই সতর্কবার্তার ভিত্তিতেই স্প্যানিশ সামুদ্রিক উদ্ধারকারী দল বা মেরিটাইম রেসকিউ আটলান্টিকের বুকে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করে এবং অবশেষে নৌযানটির সন্ধান পেতে সক্ষম হয়।
প্রথমদিকে স্পেনের অন্যতম প্রধান সংবাদ সংস্থা ইএফই নোটিসিয়াস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিল যে, উদ্ধারকৃত নৌযানটি থেকে আশি জন অভিবাসীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে পরবর্তীতে স্প্যানিশ সামুদ্রিক উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ এই তথ্যের একটি আনুষ্ঠানিক সংশোধনী প্রকাশ করে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে। তারা নিশ্চিত করে যে, স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে নৌযানটি থেকে মোট চুয়াল্লিশ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং সেখান থেকে পাঁচটি নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। টানা প্রায় এক মাস সমুদ্রে পর্যাপ্ত খাবার ও সুপেয় পানীয় জল ছাড়া ভাসতে থাকার কারণে তারা চরম পানিশূন্যতা, মারাত্মক অপুষ্টি ও গভীর মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা ক্যামিনান্দো ফ্রন্টেরাস-এর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যাত্রা শুরুর সময় ওই ছোট নৌযানটিতে নারী ও শিশুসহ সর্বমোট একশ সাতাশ জন যাত্রী ছিলেন। কিন্তু উদ্ধার অভিযানের পর চুয়াল্লিশ জন জীবিত এবং পাঁচজনের মৃতদেহ পাওয়া যাওয়ায় বাকি প্রায় আশি জনেরও বেশি মানুষকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত বা নিখোঁজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
নিখোঁজ হওয়া এই হতভাগ্য মানুষদের মধ্যে অন্তত চারজন নারী এবং একটি নিষ্পাপ শিশুও রয়েছে বলে তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংস্থাটির একজন মুখপাত্র অত্যন্ত আবেগঘন ও শোকাহত কণ্ঠে জানান, নৌযানটি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে ছাব্বিশটি দীর্ঘ দিন ধরে যাত্রীদের পরিবারের সদস্যরা চরম উৎকণ্ঠা ও খারাপ কিছুর আশঙ্কায় তাদের কাছে বারবার যোগাযোগ করছিলেন।
স্বজনদের সেই মর্মান্তিক আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত এক নিদারুণ সত্যে পরিণত হলো। উদ্ধার অভিযানের পর নৌযানটিকে স্পেনের গ্রান ক্যানারিয়া দ্বীপের আর্গুইনেগুইন বন্দরে নিরাপদে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা রেড ক্রসের চিকিৎসাকর্মীরা জীবিতদের জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা প্রদান করেন।
রেড ক্রসের কর্মীদের কাছে বেঁচে ফেরা অভিবাসীরা ভয়াবহ সেই দিনগুলোর কথা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, তারা একশ জনেরও বেশি মানুষ নিয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু সমুদ্রের বুকে তাদের সেই স্বপ্ন অচিরেই এক ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়।
আফ্রিকা থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ হয়ে ইউরোপে প্রবেশের এই আটলান্টিক রুটটি বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী এবং বিপজ্জনক অভিবাসন পথ হিসেবে পরিচিত। ইনফো মাইগ্রেন্টস-এর দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই মর্মান্তিক ঘটনার ঠিক এক দিন আগেই পশ্চিম সাহারা অঞ্চল থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর চেষ্টাকালে দুইশ এক জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে বহনকারী একটি নৌযানকে মাঝপথে বাধা দেয় মরক্কোর নৌবাহিনী।
মরক্কোর সামরিক বাহিনীর জেনারেল স্টাফের তথ্যমতে, দাখলা উপকূল থেকে প্রায় একশ পঁচাশি কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ওই নৌযানটিকে আটকে দেওয়া হয়। এই ঘটনাগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, জীবনের চরম ঝুঁকি থাকার পরও উন্নত ভবিষ্যতের আশায় অসংখ্য মানুষ প্রতিনিয়ত মানবপাচারকারীদের প্ররোচনায় এই বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এর ফলে সাগরের বুকে একের পর এক মর্মান্তিক মৃত্যু উপত্যকা তৈরি হচ্ছে, যা রোধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।