মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
হোয়াইট হাউসে জেলেনস্কির গুরুত্বপূর্ণ সফর

ইউক্রেন যুদ্ধে ট্রাম্পের জোরালো সমর্থন আদায়ে কিয়েভের কূটনৈতিক তৎপরতা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০২:০৫ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধে ট্রাম্পের জোরালো সমর্থন আদায়ে কিয়েভের কূটনৈতিক তৎপরতা
ছবি : Collected

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের দীর্ঘ পথচলায় এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও রূপান্তরকামী মুহূর্তে ওয়াশিংটন অভিমুখে পা বাড়াচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে এবং ট্রানজিটের এই সংকটকালে মার্কিন প্রশাসনের সরাসরি ও সুনির্দিষ্ট সমর্থন অর্জনের লক্ষ্যে মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন ইউক্রেনীয় প্রধান।

 

মস্কো ও কিয়েভ উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা যখন আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া কূটনৈতিক সংলাপগুলো এক ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়েছে, ঠিক তখনই এই শীর্ষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

 

ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ক্রেমলিনের পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরুর চার বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি বা রক্তক্ষয় বন্ধে দৃশ্যমান কোনো সমঝোতা তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া এই সফরটি তাই বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যকার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই কিছুটা জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার পটপরিবর্তনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মানসিকতায় ইউক্রেনীয় সংকটের প্রতি কিছুটা ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে।

 

হোয়াইট হাউসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অতি সম্প্রতি জানান যে, মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই ব্যস্ত সূচির মধ্যেই একই দিনে ইউক্রেনের দীর্ঘদিনের দৃশ্যমান সমর্থক এবং বিশিষ্ট মার্কিন সিনেটর প্রয়াত লিন্ডসে গ্রাহামের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক বিশেষ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে।

 

চলতি মাসেই ৭১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের অবদান ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। আসন্ন শীর্ষ বৈঠক প্রসঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তাঁর প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করে জানান যে, ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর পূর্ণাঙ্গ দলের সঙ্গে আলোচনার জন্য কিয়েভ সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

 

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই সংকটময় মুহূর্তে ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় সমর্থন অব্যাহত রাখবে, যাতে একটি মর্যাদাপূর্ণ, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শান্তির মাধ্যমে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চূড়ান্ত অবসান ঘটানো সম্ভব হয়।

 

কিয়েভের এই বক্তব্য এটাই নির্দেশ করে যে, একটি সার্বিক জাতীয় সুরক্ষার জন্য ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত ভূমিকা ইউক্রেনের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য কতটা অপরিহার্য।

 

উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প বিগত বছরের জানুয়ারিতে পুনরায় হোয়াইট হাউসের মসনদে আসীন হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনের কিয়েভকেন্দ্রিক নিরাপত্তা নীতিতে উল্লেখযোগ্য নীতিগত পরিবর্তন সাধিত হয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনে সরাসরি মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের পূর্ববর্তী ধারাবাহিকতা অনেকটাই সংকুচিত করে আনে।

 

এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন একটি বিকল্প কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক রূপরেখা চালু করে, যা পিইউআরএল কর্মসূচি নামে পরিচিতি লাভ করে। এই নতুন ব্যবস্থাপনার অধীন ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো বাজার থেকে নিজ অর্থে অস্ত্র কিনে তা ইউক্রেনের কাছে সরবরাহ করার সুযোগ পায়।

 

এর ফলে মার্কিন সরাসরি সামরিক অর্থায়নের ওপর চাপ কমলেও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মাধ্যমে কিয়েভের অস্ত্র সরবরাহ সচল রাখার এক দ্বিমুখী পথ উন্মুক্ত হয়। কৌশলগত নীতিতে পরিবর্তন এলেও পূর্ব ইউরোপের বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী মিত্র হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।

 

বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রের সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সংঘাতকবলিত অঞ্চলে ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য মহাকাশভিত্তিক স্টারলিংক স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে ব্যবহারের সুযোগ বহাল রেখে ওয়াশিংটন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

 

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই যুদ্ধের ময়দানে এই জাতীয় কারিগরি সহযোগিতা ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা বজায় রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ফলে বর্তমান সংকটের মুখে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি কেবল দুই দেশের দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কে নয়, পুরো পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা সমীকরণে এক অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

 

হোয়াইট হাউসের এই বহুল আলোচিত বৈঠকটিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ইউক্রেনীয় যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে অভিহিত করছেন। যুদ্ধের ক্লান্তি যখন বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নানা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তখন ওয়াশিংটনের সমর্থন আদায়ে জেলেনস্কির এই কূটনৈতিক সফর ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বা নতুন কোনো সমঝোতার দুয়ার উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কেবল সামরিক ময়দানেই নয়, বরং মার্কিন প্রশাসনের মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে সামনের দিনগুলোতে সম্ভাব্য যে কোনো আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনার পথ ও ধরন নির্ধারিত হতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনের রাজপথে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভলোদিমির জেলেনস্কির মুখোমুখি বসা বিশ্বনেতৃত্বের কাছে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

 

- এএফপি