শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার এক বিশেষ বিমানে করে মস্কোর ভনুকোভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর এই দুই উচ্চপদস্থ মার্কিন প্রতিনিধিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভ। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এবং রুশ সংবাদ সংস্থা তাস নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল যে, উইটকফ এবং কুশনার চলতি সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে মস্কো এবং কিয়েভ সফর করবেন।
এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন যে, মস্কো সফর শেষে রোববার মার্কিন দূতরা ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে পৌঁছাবেন। উল্লেখ্য, মার্কিন মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকে স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার বেশ কয়েকবার মস্কো সফর করলেও, কিয়েভে এটিই তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর হতে যাচ্ছে।
এর আগে গত ২২ জানুয়ারি সর্বশেষ মস্কো সফরে তারা ক্রেমলিনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছিলেন। কিয়েভে তাদের এই প্রথম সফর ঘিরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের বিষয়ে শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গণমাধ্যমের কাছে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, তাঁর জামাতা কুশনার এবং বিশেষ দূত উইটকফ মস্কোয় কোনো নতুন ও অপরীক্ষিত প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছেন না, বরং তাদের সঙ্গে এমন একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে যার মূল লক্ষ্যই হলো এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানো।
ট্রাম্প বলেন, "তারা যুদ্ধ অবসানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন।" এই সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ক্ষেত্রে বিরাজমান জটিলতাগুলোর কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প এর জন্য মূলত পুতিন এবং জেলেনস্কির মধ্যকার চরম বৈরী ব্যক্তিগত সম্পর্ককে দায়ী করেন।
তিনি মন্তব্য করেন, "রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের পেছনে একটি বড় ব্যক্তিত্বের সমস্যা রয়েছে। একদিকে আছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পুতিন। তারা সত্যিকার অর্থেই একে অপরকে তীব্রভাবে ঘৃণা করেন।"
ব্যক্তিগত এই বৈরিতার পরও সংঘাত অবসানের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, যুদ্ধ বন্ধের দিকে কোনো বাস্তব ও দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করে দেখার জন্যই তিনি উইটকফ এবং কুশনারকে এই বিশেষ মিশনে মস্কোয় পাঠিয়েছেন।
এই দুই দূতের ওপর নিজের পূর্ণ আস্থার কথা জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, "তারা দুজনেই অসাধারণ ও অত্যন্ত দক্ষ আলোচক। তারা অতীতেও চমৎকারভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন।" সংঘাত অবসানের সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি আরও যোগ করেন, "উভয় পক্ষের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এবার বেশ ভালো একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।"
চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার রাশিয়া ও ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে বসানোর জন্য বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। মার্কিন মধ্যস্থতায় মস্কো এবং কিয়েভের মধ্যে এর আগে তিন দফায় অত্যন্ত নিবিড় শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় দফার আলোচনা হয় ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকই সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে আয়োজিত হয়েছিল।
এরপর ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তৃতীয় দফার শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা বেশ কিছু জটিল বিষয় নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন।
তবে জেনেভায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় দফার পর এই শান্তি আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। মস্কো এবং কিয়েভের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।
এই আকস্মিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ইউক্রেন থেকে সরে গিয়ে ইরানের দিকে নিবদ্ধ হয়। ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হওয়ায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে।
তবে দীর্ঘ কয়েক মাসের বিরতির পর উইটকফ ও কুশনারের এই জোড়া সফরের মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের এই ভয়াবহ সংঘাত অবসানে পুনরায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা প্রাণ ফিরে পেয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।