আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্টের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এক দশকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইউরোপীয় দেশগুলোতে এই ধরনের সংক্রমণের হার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। একসময় যে রোগগুলোকে প্রায় নির্মূলের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল, সেগুলোই এখন নতুন করে মহামারি আকার ধারণ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, সঠিক সময়ে এই রোগগুলো শনাক্ত করা সম্ভব না হলে এবং যথাযথ চিকিৎসার অভাব ঘটলে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক ব্যথা, প্রজনন অক্ষমতা বা চিরস্থায়ী বন্ধ্যাত্ব, এমনকি মারাত্মক স্নায়বিক ও হৃদরোগের মতো প্রাণঘাতী জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন। এই পরিস্থিতিকে আধুনিক ইউরোপের অন্যতম প্রধান ও নীরব স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
এই অপ্রত্যাশিত ও দ্রুত সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ দায়ী নয়, বরং বেশ কিছু সামাজিক, মানসিক এবং স্বাস্থ্যগত নিয়ামক একত্রে কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো, এইচআইভি বা এইডস নিয়ে মানুষের মনে কয়েক দশক ধরে যে প্রবল আতঙ্ক বা মৃত্যুভয় কাজ করত, তা বর্তমানে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি এবং প্রি-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস বা প্রেপ-এর মতো প্রতিরোধমূলক ওষুধের সহজলভ্যতার কারণে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এর একটি ভয়াবহ নেতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ এখন অরক্ষিত যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কনডম বা অন্যান্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রতি চরম অনীহা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াজনিত যৌনরোগ ছড়ানোর পথকে অনেক বেশি প্রশস্ত করে দিয়েছে।
এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব, বিশেষ করে বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপের ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহারের কারণে মানুষের মেলামেশা ও সঙ্গী নির্বাচনের ধরন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তাৎক্ষণিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে, ইউরোপের স্বাস্থ্যসেবা খাতের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। উন্নত বিশ্ব হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপের অনেক দেশে যৌনরোগ পরীক্ষা বা প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত সরকারি বাজেটে ব্যাপক কাটছাঁট করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষকে এসটিআই পরীক্ষা করানোর জন্য চিকিৎসাকেন্দ্রে নিজেদের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এই মাত্রাতিরিক্ত খরচের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী বা সাধারণ নাগরিকরা প্রায়শই সামান্য লক্ষণ দেখা দিলেও পরীক্ষা করানো থেকে বিরত থাকছেন। শুধু তাই নয়, বৈশ্বিক করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর ওপর যে প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাব এখনো বিদ্যমান। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পুরোনো ও অকার্যকর কৌশলগুলো এই নতুন আধুনিক বাস্তবতায় একেবারেই কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে না।
পরিসংখ্যান বলছে, ঐতিহাসিকভাবে সমকামী বা উভকামী পুরুষদের মধ্যে এই ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা গেলেও, বর্তমান চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি উদ্বেগজনক। বর্তমানে বিষমকামী বা হেটারোসেক্সুয়াল পুরুষ এবং নারীদের মধ্যেও এই সংক্রমণের হার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানবিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের মধ্যে সিফিলিস আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া। গর্ভাবস্থায় মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাবে গর্ভজাত শিশুর শরীরে জন্মগত সিফিলিস সংক্রমণের হার ইতিমধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
চিকিৎসকদের মতে, সদ্য জন্ম নেওয়া এই শিশুদের ক্ষেত্রে এটি এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এর ফলে অপরিণত শিশুর জন্ম বা জন্মের পরপরই শিশুমৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে।
এই ক্রমবর্ধমান ও জটিল সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা, চিকিৎসা গবেষক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের জরুরি ভিত্তিতে কিছু কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
এর মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে যৌনরোগ পরীক্ষার সুযোগ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় অত্যন্ত সহজে পৌঁছে দেওয়া এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে বিনা মূল্যে বা অত্যন্ত স্বল্প খরচে পরীক্ষার সুব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার নিয়মাবলি আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং রোগ শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে এর বিস্তার রোধ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হলো, এখনই যদি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি এবং সময়োপযোগী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপকে যৌনরোগের এক ভয়াবহ ও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন মহামারির মুখোমুখি হতে হবে, যা সমগ্র মহাদেশে এক বিশাল মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।