সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২৬
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক জোট শক্তিশালী করছে রাশিয়া!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৫:০২ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক জোট শক্তিশালী করছে রাশিয়া!
ছবি : Collected

পূর্ব ইউরোপে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে মস্কো তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইরান, উত্তর কোরিয়া এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত ও সামরিক সহযোগিতা আরও নিবিড় করছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে তিনি এই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জেলেনস্কির এই বক্তব্য এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এল, যখন ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ এক নতুন এবং জটিল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

 

এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন আর কেবল দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সঙ্গে বিভিন্ন পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধের এক বিপজ্জনক আবহ তৈরি হয়েছে, যা গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

 

ওই সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নানা চাপ এবং সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতির মুখে পড়ে রাশিয়া এখন এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছে।

 

তিনি একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরে আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই ক্রমবর্ধমান জোটবদ্ধতার অংশ হিসেবে মিত্র রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়া খুব শিগগিরই রাশিয়ায় প্রায় ত্রিশ হাজার সুপ্রশিক্ষিত সেনা পাঠাতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিপুল সংখ্যক সেনাসদস্য সরাসরি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ বাহিনীর সামরিক অভিযানে অংশ নেবে।

 

একই সঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সামরিক শক্তি ইরান মস্কোকে আরও বিপুল পরিমাণ ও অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এই নতুন মাত্রার সমরাস্ত্র সরবরাহ এক অভাবনীয় ও বিশাল সামরিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন।

 

চীন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপ্রধান জানান, বেইজিং সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ না করলেও রাশিয়ার সামরিক অর্থনীতি ও শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তারা পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে রাশিয়ার প্রতি ইরানের সামরিক সমর্থনের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে তার বক্তব্যে।

 

রাশিয়াকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে ইরান ইতোমধ্যে এই প্রলম্বিত যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে বলে কড়া মন্তব্য করেন জেলেনস্কি। ইউক্রেনের ওপর ইরানের সম্ভাব্য নতুন কোনো হামলার বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্বিগ্ন কি না, গণমাধ্যমের এমন এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত সাবলীল অথচ দৃঢ় ভাষায় তেহরানের দ্বিমুখী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন।

 

তেহরানের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে জেলেনস্কি বলেন, “আমরা তাদের কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারি না। এর একটি সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। যুদ্ধের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে যখন আমাদের পক্ষ থেকে নিজস্ব কোনো উন্নত অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তেই ইরানিরা মস্কোর হাতে বিপুল পরিমাণ প্রাণঘাতী সমরাস্ত্র তুলে দিয়েছিল।”

 

মূলত সেই ইরানি সামরিক প্রযুক্তির আঘাতেই ইউক্রেনের অসংখ্য বেসামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, যা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ডেকে এনেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি এবং মিত্রদের আগ্রাসী ভূমিকার কথা উল্লেখ করে জেলেনস্কি বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেন যে, এই সংঘাত যেন ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে অন্য কোনো নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই কড়া নজর রাখতে হবে।

 

তিনি বলেন, “বিশ্বে যাতে আরেকটি নতুন রণক্ষেত্র বা যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি না হয়, তার জন্য আমাদের সম্ভাব্য সবকিছুই করতে হবে।” তবে বাস্তবতার কঠিন চিত্র তুলে ধরে তিনি চরম আক্ষেপের সুরে বলেন, “আমরা নতুন কোনো ফ্রন্ট চাই না ঠিকই, কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো ইরানি এবং উত্তর কোরীয়রা তাদের সমরাস্ত্র ও সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইতোমধ্যে আমাদের ওপর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে হামলা চালিয়েছে।”

 

আল জাজিরার সূত্রমতে, ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের এই সময়োচিত সতর্কবার্তা এমন এক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে নির্দেশ করছে, যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব একদিকে কিয়েভকে টিকে থাকার সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, আর অন্যদিকে রাশিয়া তার সামরিক ঘাটতি পূরণে মিত্রদের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমেই বাড়াচ্ছে।

 

চীন, ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সমন্বয় আগামী দিনগুলোতে ইউরোপের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী, ভয়াবহ এবং ধ্বংসাত্মক করে তুলতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই ধরনের বহুমুখী সামরিক আঁতাত ঠেকাতে পশ্চিমা বিশ্বকে আরও কঠোর, বাস্তবমুখী ও কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন ভলোদিমির জেলেনস্কি।

 

- আল জাজিরা