শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘বসনিয়ার কসাই’ খ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিককে সার্বিয়ার সামরিক মর্যাদা প্রদান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম

‘বসনিয়ার কসাই’ খ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিককে সার্বিয়ার সামরিক মর্যাদা প্রদান
ছবি : Collected

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় হাজার হাজার নিরীহ মুসলিমকে হত্যার মূল হোতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী জেনারেল রাতকো ম্লাদিককে সামরিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়েছে সার্বিয়া সরকার।

 

‘বসনিয়ার কসাই’ হিসেবে কুখ্যাত এই সাবেক সার্বিয়ান কমান্ডার সম্প্রতি ৮৪ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) একটি নিয়ন্ত্রিত কারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর সার্বিয়ার পক্ষ থেকে তাকে যে আনুষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ের মূল নায়ককে এমন সম্মাননা প্রদান করার বিষয়টি আধুনিক ইউরোপের বিচারিক ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি সরাসরি অবজ্ঞা হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীরা। বলকান অঞ্চলে নব্বইয়ের দশকের সেই ভয়াবহ যুদ্ধের স্মৃতি আজও বিশ্ববাসীর মনে এক গভীর ক্ষতের মতো রয়ে গেছে।

 

এমন পরিস্থিতিতে একজন প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মহিমান্বিত করার বিষয়টি যুদ্ধাহত এবং স্বজনহারা পরিবারগুলোর প্রতি এক ধরনের চরম উপহাস বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

গত বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডসের হেগ শহর থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে এই দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীর মরদেহ সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে এসে পৌঁছায়। বেলগ্রেড বিমানবন্দরে এক অভাবনীয় ও বিতর্কিত দৃশ্যের অবতারণা হয়, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গভীরভাবে বিস্মিত করেছে।

 

ম্লাদিকের কফিনটি সার্বিয়ার জাতীয় পতাকায় সযত্নে মোড়ানো ছিল এবং সামরিক বাহিনীর পূর্ণ আনুষ্ঠানিক পোশাকে সজ্জিত ছয়জন সেনা সদস্য তার কফিন অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে বহন করেন। রাষ্ট্রীয় এই প্রটোকল চলাকালীন সেখানে উপস্থিত ছিলেন সার্বিয়ার বর্তমান বিচারমন্ত্রী নেনান্দ ভুজিক এবং ম্লাদিকের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা, বিশেষ করে তার ছেলে।

 

বিমানবন্দর থেকে কড়া পুলিশি পাহারায় এবং বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে মরদেহটি বেলগ্রেডের একটি শীর্ষস্থানীয় সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সার্বিয়ার সরকার আগেই স্পষ্ট করে জানিয়েছিল যে, এই সাবেক সামরিক জেনারেলকে রাষ্ট্রীয় সম্মানের সঙ্গে শেষ বিদায় জানানো হবে।

 

স্বয়ং সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুকিক গত সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে ম্লাদিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাকে এই বিদায়ী সম্মান জানানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। বেলগ্রেডের সামরিক হাসপাতালে বর্তমানে তার মরদেহের চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

 

মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে এই ময়নাতদন্ত বা শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই আইনি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর সমাহিত করার জন্য মরদেহটি তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

 

দণ্ডিত একজন মানবতাবিরোধী অপরাধীকে এমন রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করার সার্বিয়ান সরকারের এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে এক কড়া বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, রাতকো ম্লাদিকের মতো একজন প্রমাণিত গণহত্যাকারী এবং যুদ্ধাপরাধীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কোনো স্থান গণতান্ত্রিক ইউরোপের মাটিতে থাকতে পারে না।

 

ইইউ জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, এ ধরনের জঘন্য অপরাধ এবং অপরাধীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মহিমান্বিত করার যেকোনো চেষ্টা ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার এবং ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 

ইতিহাসের পাতায় রাতকো ম্লাদিকের নাম অত্যন্ত ভয়াবহ এবং নিষ্ঠুরভাবে খোদিত রয়েছে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সার্বিয়ান বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

 

বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা শহরে জাতিসংঘের নির্ধারিত ‘সেফ এরিয়া’ বা নিরাপদ অঞ্চলে জোরপূর্বক প্রবেশ করে তার প্রত্যক্ষ নির্দেশে প্রায় আট হাজার মুসলিম পুরুষ ও বালককে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়।

 

নারী ও শিশুদের জোরপূর্বক আলাদা করে কেবল জাতিগত পরিচয়ের কারণে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় এবং সুপরিকল্পিত গণহত্যার ঘটনা।

 

এই অভাবনীয় নৃশংসতার কারণেই বিশ্ব গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাকে ‘বসনিয়ার কসাই’ উপাধিতে আখ্যায়িত করেছিল। স্রেব্রেনিৎসার ওই ভয়াবহ গণহত্যার পর বিশ্বজুড়ে মানবতাবাদী মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলে ম্লাদিক দীর্ঘ সময় ধরে আত্মগোপনে চলে যান।

 

আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নাগাল এড়িয়ে প্রায় দেড় দশক লুকিয়ে থাকার পর, শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের মে মাসে সার্বিয়ার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে তাকে অত্যন্ত গোপনীয় অভিযানের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাকে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হাতে বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয়।

 

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ২০১৭ সালে আদালত তাকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে।

 

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক ম্লাদিকের এই হত্যাকাণ্ডকে ‘মানবজাতির ইতিহাসে সংঘটিত জঘন্যতম অপরাধগুলোর অন্যতম’ হিসেবে সুস্পষ্টভাবে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে এই রায়ের বিরুদ্ধে ম্লাদিকের করা চূড়ান্ত আপিলও আদালত খারিজ করে দেয়। তার মৃত্যু এবং তৎপরবর্তী এই সামরিক সম্মাননা বলকান অঞ্চলের ক্ষতবিক্ষত ইতিহাসকে আবারও নতুন করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নিয়ে এসেছে।

 

- সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট