সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২৬
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধে প্রভাব বাড়াতে উত্তর কোরিয়া থেকে আরও ত্রিশ হাজার সেনা আনছে রাশিয়া : জেলেনস্কি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০২:৩২ পিএম

যুদ্ধে প্রভাব বাড়াতে উত্তর কোরিয়া থেকে আরও ত্রিশ হাজার সেনা আনছে রাশিয়া : জেলেনস্কি
ছবি : Collected

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নিজেদের সামরিক অবস্থান আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উত্তর কোরিয়া থেকে অতিরিক্ত ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়োজিত করার এক বিরাট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে রাশিয়া।

 

সাম্প্রতিক এক আবেগঘন অথচ দূরদর্শী ভিডিও বার্তায় এই চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি অভিযোগ করেন যে, পিয়ংইয়ং থেকে আসা এই নতুন বৃহৎ সামরিক বহরকে নিজেদের ভূখণ্ডে গ্রহণ করতে এবং তাদের আবাসন ও প্রয়োজনীয় রসদের সংস্থান নিশ্চিত করতে ক্রেমলিন ইতোমধ্যে নেপথ্যে ব্যাপক বিস্তৃত প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

 

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির এই নতুন তথ্য ফাঁসের পর পূর্ব ইউরোপের রণক্ষেত্র থেকে শুরু করে দূরপ্রাচ্যের এশীয় অঞ্চল পর্যন্ত নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ ও গভীর নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপ্রধান উল্লেখ করেন যে, এটি হঠাৎ নেওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়, বরং মস্কো ও পিয়ংইয়ংকে ক্রমশ কাছাকাছি নিয়ে আসা দ্বিপক্ষীয় গভীর সামরিক সহযোগিতারই একটি ধারাবাহিক সম্প্রসারণ।

 

গত দুই হাজার চব্বিশ সালে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই কৌশলগত চুক্তির শর্ত ও আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এর পূর্বে প্রথম দফায় উত্তর কোরিয়া থেকে প্রায় চৌদ্দ হাজার প্রশিক্ষিত সেনাসদস্যকে রাশিয়ার সীমান্তঘেঁষা কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছিল।

 

তবে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ক্রমাগত প্রতিরোধ ও সাম্প্রতিক সময়ের যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তিত গতিশীলতার মুখে ক্রেমলিন এখন তাদের বর্তমান সেনাবল বহুগুণ বৃদ্ধি করার জোর তাগিদ অনুভব করছে। তারই অংশ হিসেবে পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে আরও ত্রিশ হাজার সৈন্য হস্তান্তরের এই নতুন সামরিক আলোচনা ও চুক্তি চূড়ান্ত রূপ লাভ করছে।

 

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দেওয়া সুনির্দিষ্ট সামরিক তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া থেকে আগমনী এই বিপুলসংখ্যক সেনা সদস্যদের অভ্যর্থনা জানাতে এবং তাদের কৌশলগতভাবে প্রস্তুত রাখার উদ্দেশে রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ভোরোনেঝ বিভাগে গত চলতি বছরের জুন মাস থেকেই ব্যাপক কাঠামোগত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

 

শুধু দূরবর্তী দেশ থেকে হাজার হাজার সামরিক সদস্য আনাতেই এই দুই মিত্র দেশের যৌথ তৎপরতা সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং যুদ্ধক্ষেত্রের ধ্বংসক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়াতে উত্তর কোরিয়া এবার রাশিয়াকে নতুন প্রযুক্তির সর্বাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক বা দূরপাল্লার লঞ্চার সরবরাহ করারও চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে।

 

ফলে ইউক্রেনের বেসামরিক লোকালয় ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর রুশ বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা আরও মারাত্মক ও তীব্র আকার ধারণ করার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের এই নতুন এবং বিপজ্জনক মাত্রা বৃদ্ধি কেবল পূর্ব ইউরোপের সীমান্তরেখাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এক কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।

 

তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্মরণ করিয়ে দেন যে, উত্তর কোরিয়ার এই প্রত্যক্ষ সামরিক অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের নিয়মিত উপস্থিতির বিষয়টি শুধু ইউক্রেন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্যই এক অস্তিত্বসংকট নয়, বরং তা সমগ্র এশিয়া মহাদেশের আঞ্চলিক স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর এক বিশাল বিপর্যয়কর হুমকি তৈরি করছে।

 

ইউরোপের এই উন্মুক্ত রণক্ষেত্রে লড়াই করার মাধ্যমে উত্তর কোরীয় সেনারা সরাসরি আধুনিক ও জটিল যুদ্ধকৌশলের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে, যা তাদের কৌশলগত দক্ষতা বাড়াচ্ছে।

 

এর পাশাপাশি রাশিয়ার উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তায় তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ ক্ষেপণাস্ত্র ও মারণাস্ত্র ভাণ্ডারের আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়ন ঘটাচ্ছে, যা পিয়ংইয়ংয়ের দূরপাল্লার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যে থাকা প্রতিবেশী সমস্ত এশীয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে চরম ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকিতে ফেলবে।

 

এমতাবস্থায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত নীরবতা ও নিশ্চুপ ভূমিকা সমগ্র বিশ্বের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসতে পারে বলে মতপ্রকাশ করেন ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপ্রধান। তবে বহিঃশক্তির এই রূপ সম্মিলিত হুমকি, অশুভ আঁতাত ও ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপ সত্ত্বেও ইউক্রেন আত্মসমর্পণ করবে না কিংবা পিছিয়ে যাবে না বলে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি।

 

তিনি স্পষ্ট ভাষায় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, নিজেদের মাতৃভূমির প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি রক্ষা করতে ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো মূল্যে এই অন্যায্য এবং যৌথ আগ্রাসনের উপযুক্ত ও কঠোর সামরিক জবাব প্রদান করবে। বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে ইউক্রেনের পাশে আরও জোরালোভাবে দাঁড়ানোর আকুল আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে তিনি তার এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সমাপ্ত করেন।

 

রয়টার্স