রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান-মার্কিন সংঘাতের জেরে ইউরোপে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কা, লাগার্দ 

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম

ইরান-মার্কিন সংঘাতের জেরে ইউরোপে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কা, লাগার্দ 
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার নেতিবাচক প্রভাব যে কেবল যুদ্ধকবলিত অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিকেই চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়, তার আরও একটি দৃশ্যমান প্রমাণ পাচ্ছে বর্তমান বিশ্ব।

 

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ইউরোপের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার অতীতের সকল পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে আরও দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করবে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি)।

 

বৈশ্বিক অর্থনীতির এই নাজুক পরিস্থিতিতে ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় চরম সংকটের মুখে পড়েছে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহল। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং শিল্প খাতের অচলাবস্থা ইউরোপীয় অর্থনীতিকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।

 

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সামরিক ও কৌশলগত সংঘাত এবং অন্যদিকে রাশিয়ার তেল পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি ইউরোপের দেশগুলোর উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার চূড়ান্ত দায়ভার চাপছে সাধারণ ভোক্তাদের কাঁধে।

 

ক্রিস্টিন লাগার্দের মতে, বর্তমানের এই সংকট কেবল সাময়িক কোনো বিষয় নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এক ভয়াবহ ও কাঠামোগত হুমকি তৈরি করছে। জ্বালানি খাতের এই অস্থিতিশীলতা ইউরোপের সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় অর্থনীতি এমনিতেই পূর্ববর্তী বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটের ধাক্কা সামলে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। ঠিক এমন একটি সন্ধিক্ষণে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এই অস্থিরতা ইউরোপের শিল্প ও উৎপাদন খাতকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে।

 

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার অতি আবশ্যক কাঁচামালের দাম হু হু করে বাড়ছে। এর ফলে সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে, তেমনি ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকাও সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

ক্রিস্টিন লাগার্দ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ভূ-রাজনৈতিক এই সংঘাতগুলো দ্রুত নিরসন না হলে এবং জ্বালানির বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল না হলে, ইউরোপের জন্য সামনের দিনগুলো আরও বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন ও সংঘাতময় হতে পারে।

 

মূল্যস্ফীতির এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কোনোমতে ধরে রাখতে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যেই কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে।

 

ক্রিস্টিন লাগার্দের সাম্প্রতিক এই উদ্বেগজনক মন্তব্যের পরপরই ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সুদের হার আরও এক দফা বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। প্রাপ্ত আর্থিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এটি ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বিতীয়বারের মতো সুদের হার বৃদ্ধির ঘটনা।

 

নতুন এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে আমানতের সুদের হার বৃদ্ধি পেয়ে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও, এটি একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতিকে মারাত্মকভাবে মন্থর করে দিতে পারে।

 

সামগ্রিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, বিশ্বের এক প্রান্তের রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত কীভাবে অন্য প্রান্তের অর্থনীতিকে তছনছ করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং রাশিয়ার জ্বালানি খাতের উপর নির্ভরশীলতার কাঠামোগত সংকট একত্রিত হয়ে ইউরোপকে এক বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

 

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুদ্রানীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে পূর্ণাঙ্গ স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত ইউরোপের সাধারণ নাগরিকদের মূল্যস্ফীতির এই দীর্ঘস্থায়ী ও কষ্টদায়ক বোঝা বহন করেই চলতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

 

বিশ্ব অর্থনীতির এই জটিল সমীকরণে ইউরোপীয় দেশগুলো আগামী দিনগুলোতে কীভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান সুরক্ষিত রাখবে, সেটাই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

 

- পার্সটুডে