সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ রুশ নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে এই যুদ্ধে আহত হয়েছেন আরও অন্তত পনেরো লাখ মানুষ, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের অন্যতম শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং এয়ার চিফ মার্শাল রিচ নাইটন সম্প্রতি একটি আনুষ্ঠানিক ভিডিও বার্তায় এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে পাঠানো ওই বার্তায় তিনি এই বিপুল প্রাণহানিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক, অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন।
যুক্তরাজ্যের অত্যন্ত চৌকস সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা একটি সাম্প্রতিক ও গোপনীয় প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে এয়ার চিফ মার্শাল রিচ নাইটন এই গুরুতর দাবি উপস্থাপন করেন।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের মাটিতে রাশিয়ার সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হতাহতদের মধ্যে একটি বড় অংশই সশস্ত্র সামরিক বাহিনীর সদস্য, যারা সরাসরি সম্মুখ সমরে লড়াইরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন।
ভিডিও বার্তায় যুক্তরাজ্যের এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা একটি চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরে বলেন যে, প্রাণহানির এই বিশাল সংখ্যাটির সিংহভাগই ঘটেছে মূলত ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের পর থেকে। যখন যুদ্ধ একটি দীর্ঘস্থায়ী ও স্থবির পর্যায়ে প্রবেশ করে, ঠিক তখনই হতাহতের মাত্রা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।
সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হলো, এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনের বিনিময়ে এবং বিশাল সামরিক সরঞ্জাম ব্যয় করেও রুশ বাহিনী ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের মাত্র দুই শতাংশ নিজেদের পূর্ণাঙ্গ দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে।
যুদ্ধের এই ভয়াবহ মানবিক মূল্য এবং এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাবের কথা তুলে ধরে রিচ নাইটন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এই নির্মম পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের চোখের সামনে একটি নিষ্ঠুর বাস্তবতা ও মানবিক ট্র্যাজেডিকে তুলে ধরছে।
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি সম্পূর্ণ অন্যায্য, অযৌক্তিক এবং ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষামূলক লক্ষ্য অর্জনের জন্য কীভাবে সাধারণ মানুষের অমূল্য জীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন ও বৃথাভাবে অপচয় হচ্ছে, এটি তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে আরও যুক্ত করেন, এই বিপুল মৃত্যুর প্রকৃত অর্থ হলো-রাশিয়ার অন্তত পাঁচ লাখ বিষণ্ণ, স্তব্ধ ও অন্ধকার বাড়ির দেওয়ালে আজ নিহত সেনাদের ছবি বেদনার স্মৃতি হয়ে ঝুলছে।
রাশিয়ার প্রায় পাঁচ লাখ নিরীহ পরিবার তাদের প্রাণপ্রিয় বাবা, ভাই, আদরের ছেলে কিংবা স্বামীকে চিরতরে হারিয়েছে, যাদের আর কখনোই তারা ফিরে পাবে না। এই শূন্যতা কোনো সামরিক বিজয় দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে এতো বিপুল সংখ্যক তরতাজা সেনার মর্মান্তিক মৃত্যু এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়া সত্ত্বেও ক্রেমলিনের নীতি নির্ধারকদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তনের আভাস মিলছে না।
পশ্চিমা জোটের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছেন যে, ইউক্রেন ইস্যুতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যে মূল কৌশলগত লক্ষ্য বা ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল, সেখানে কোনো ধরনের আপস, পিছু হঠা বা পরিবর্তনের সামান্যতম ইঙ্গিত তারা এখনও পর্যন্ত পাননি।
আন্তর্জাতিক মহলের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণভাবে বিপুল জনবল হারানোর মতো চরম মূল্য চোকাতে হলেও, মস্কো তাদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে এখনো অত্যন্ত অনড় ও অবিচল অবস্থানে রয়েছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই প্রলয়ংকরী সংঘাতের শিকড় মূলত একদিনে তৈরি হয়নি, বরং তা বেশ কয়েক বছর আগের ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অবিশ্বাসের মধ্যে গভীরভাবে নিহিত।
২০১৪ সালে ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে সামরিক হস্তক্ষেপে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে মস্কোর স্বীকৃতি প্রদান এবং পরবর্তীতে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত মিনস্ক চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের বহুমুখী অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চরম উত্তেজনা ও বৈরিতা বিরাজ করছিল।
এর পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভের জন্য কিয়েভের অব্যাহত জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা মস্কোকে কৌশলগত নিরাপত্তার দিক থেকে আরও বেশি ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করে তোলে।
এই সমস্ত জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের চূড়ান্ত ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি হিসেবেই ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট পুতিনের সরাসরি নির্দেশে ইউক্রেনে সর্বাত্মক সামরিক আগ্রাসন শুরু করে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান হলো, সম্প্রতি এই প্রলয়ংকরী যুদ্ধ এক হাজার ছয়শ ষাট দিন পূর্ণ করেছে। আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসের রেকর্ড ও পরিসংখ্যান নিবিড়ভাবে ঘেঁটে দেখা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ ও সুদীর্ঘ বৈশ্বিক সংঘাতগুলোতেও তৎকালীন রুশ সেনাবাহিনী একটানা যতদিন সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করেছিল, চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে ইতোমধ্যে তারা তার চেয়েও বেশি দিন অতিবাহিত করে ফেলেছে।
এটি রাশিয়ার সামরিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হিসেবে পরিগণিত হতে যাচ্ছে। অথচ এই সুদীর্ঘ সময়েও সংঘাত অবসানের কোনো সুস্পষ্ট কূটনৈতিক রূপরেখা বা শান্তি আলোচনার কোনো দৃশ্যমান সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উন্মোচিত হয়নি, যা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যই এক গভীর ও নিরন্তর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।