আগামী ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-২০ এর বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে এই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে জেলেনস্কির এই প্রস্তাব বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নতুন মাত্রার যোগ করতে পারে। সম্প্রতি জার্মানভিত্তিক স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক বিশেষ ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তাঁর এই দৃঢ় অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যদি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে সশরীরে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তবে ইউক্রেনীয় নেতা হিসেবে তিনি সেখানে তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বসতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছেন।
ডয়চে ভেলের সাংবাদিকের সরাসরি প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, "হ্যাঁ, অবশ্যই। আমাদের সেখানে উপস্থিত হতেই হবে। আমাদের দেখা করতে হবে, কথা বলতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন এখন সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলেও সমান গুরুত্ব আরোপ করতে চাইছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া যখন ইউক্রেনের ভূখণ্ডে পূর্ণমাত্রায় সামরিক আগ্রাসন শুরু করে, তারপর থেকে এই দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
এমনকি পুতিন ও জেলেনস্কি কখনো একই আন্তর্জাতিক মঞ্চেও উপস্থিত হননি। অন্যদিকে, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির সরকারি দপ্তর ও বাসভবন ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি যে, প্রেসিডেন্ট পুতিন আদৌ ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য জি-২০ জোটের ওই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন কি না।
তবে আলোচনার বিষয়ে নিজের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে জেলেনস্কি ডয়চে ভেলেকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, "কেবল কথা বলার ব্যাপারটি এখানে মুখ্য নয়। আমি তাঁকে কী বলব বা তিনি আমাকে কী বলতে চান, সেটা কোনো বড় কথা নয়। দিন শেষে ফলাফলটাই আসল। ব্যস, এটুকুই।"
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এমন এক সংকটময় সময়ে সামনে এল, যখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই ভয়াবহ যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ক্রমশ জোরদার হচ্ছে।
বিশেষ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যখন সংঘাত নিরসনে কিয়েভ ও মস্কো উভয় পক্ষের সঙ্গেই অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যোগাযোগ বৃদ্ধি করছেন, ঠিক তখনই জেলেনস্কির এই শর্তহীন বৈঠকের প্রস্তাব পরিস্থিতিকে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের সামরিক বাস্তবতার কঠিন দিকগুলোও তুলে ধরেছেন তিনি।
আসন্ন তীব্র শীতকালীন সময়ে রাশিয়ার সম্ভাব্য ভয়াবহ সামরিক হামলার মুখে তাঁর দেশ ও সাধারণ নাগরিকদের সামনে থাকা অভাবনীয় চ্যালেঞ্জগুলোর কথা তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, রাশিয়ার সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া অত্যাধুনিক জেট-চালিত ড্রোনের আক্রমণ মোকাবিলার ক্ষেত্রে ইউক্রেনের নিজস্ব আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
এই অসম সামরিক পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দেশের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে আরও বেশি পরিমাণে ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ-প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহের জন্য অত্যন্ত জরুরি ও জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থনের ভূয়সী প্রশংসা করলেও, জেলেনস্কি বর্তমান বৈশ্বিক অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখ করেন।
তিনি প্রস্তাব দেন যে, এই মুহূর্তে ইউক্রেনের ঘাটতি পূরণে মিত্র দেশগুলোকে হয়তো তাদের বিদ্যমান সামরিক মজুত থেকেই জরুরি সহায়তা প্রদান করতে হবে। এই প্রসঙ্গে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, "ওয়াশিংটন কি আমাদের এই মুহূর্তে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত? আমি ঠিক জানি না। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।"
সামরিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জেলেনস্কি যে ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন, তা ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর দেওয়া তথ্য মতে, রাশিয়া বর্তমানে তাদের সমরাস্ত্র কারখানায় প্রতি মাসে প্রায় একশ চল্লিশটি বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।
প্রতিনিয়ত উৎপাদিত এই বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের বর্তমান আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল ও প্রায় অপ্রতিরোধ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নিজের দেশের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকে তিনি বলেন, "আমি মূলত এটাই চাই।
সামনের এই কঠিন মাসগুলোতে, বিশেষ করে হাড়কাঁপানো শীতের মাসগুলোতে, আমার দেশকে রক্ষা করতে ১০০ থেকে ১২০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের একান্ত প্রয়োজন।" শীতকালে ইউক্রেনের প্রধান শহরগুলো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হাসপাতাল এবং অন্যান্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় এই বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি অত্যন্ত আবেগ ও যুক্তির সঙ্গে তুলে ধরেন।
পাশাপাশি তিনি ইউরোপীয় সামরিক মিত্রদের প্রতিও ইউক্রেনের জন্য তাদের প্রতিশ্রুত সামরিক সহায়তার পরিমাণ আরও বহুগুণ বাড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানান। তবে আশার কথা হলো, ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র জার্মানি ইতিমধ্যে ইউক্রেনের এই চরম বিপদের দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।
জার্মান সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা নিজস্ব সামরিক মজুত থেকে ইউক্রেনকে অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে, যা আসন্ন শীতকালীন প্রতিরোধ যুদ্ধে ইউক্রেনীয় বাহিনীর মনোবলকে অনেকাংশে চাঙ্গা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।