সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতালির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোরকা নিষিদ্ধ, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমাচ্ছে মেলোনি সরকার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:২১ পিএম

ইতালির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোরকা নিষিদ্ধ, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমাচ্ছে মেলোনি সরকার
ছবি : Collected

ইতালির শিক্ষাব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী এবং বিতর্কিত সংস্কার আনতে যাচ্ছে দেশটির বর্তমান সরকার। অভিবাসন নীতি এবং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষার প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ঘোষণা করেছেন যে, শিগগিরই দেশটির স্কুলগুলোতে বোরকা ও নেকাব পরিধান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হবে।

 

একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করবে রোম। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার ইতালির অন্যতম প্রধান শহর মিলানে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখার সময় প্রধানমন্ত্রী মেলোনি তার সরকারের এই নতুন ও কঠোর নীতির কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

 

ইউরোপ জুড়ে চলমান অভিবাসন বিতর্ক এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানের এই সময়ে ইতালির সরকারপ্রধানের এমন ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

মেলোনি তার ঘোষণায় জানান, একটি শ্রেণিকক্ষে সর্বোচ্চ ঠিক কত সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে, সে সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও প্রস্তাব শিগগিরই মন্ত্রিসভার আসন্ন বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হবে।

 

সরকারের এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো ইতালীয় সংস্কৃতি এবং ভাষার প্রাধান্য বজায় রাখা। প্রস্তাবিত এই নতুন নীতিমালায় শুধু শিক্ষার্থীদের জন্যই নিয়ম কানুন থাকছে না, বরং বিদেশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের জন্যও বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে।

 

বিশেষ করে যেসব বিদেশি শিক্ষার্থীর ইতালির স্কুল ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছে, তাদের অভিভাবকদের জন্য ইতালীয় ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ও এই প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন।

 

একটি সমাজে সফলভাবে একীভূত হওয়ার জন্য ভাষার দক্ষতা যে কতটা জরুরি, সেটি নিশ্চিত করতেই সরকার এমন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। স্কুলের শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কমানোর বা সীমিত করার পক্ষে অত্যন্ত জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছেন জর্জিয়া মেলোনি।

 

শিক্ষাবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতামতের প্রতিধ্বনি করে তিনি বলেন, যখন একটি শ্রেণিকক্ষে মাত্র একজন শিশু থাকে যে ইতালীয় ভাষা বোঝে না, তখন বিষয়টি সামলানো খুব সহজ হয়। সহপাঠীদের বন্ধুত্ব এবং শিক্ষকদের নিবিড় সহায়তায় সেই শিশুটি খুব দ্রুত নতুন ভাষাটি শিখে নিতে পারে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারে।

 

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ইতালীয় ভাষা না-বোঝা শিশুর সংখ্যা একটি শ্রেণিকক্ষে অনেক বেশি বেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, বিদেশি শিক্ষার্থীরা যদি কোনো স্কুলে বা শ্রেণিকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে পড়ে, তবে সেখানে তাদের ভাষা শেখানো যেমন শিক্ষকদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি স্থানীয় ইতালীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের একীভূত করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

এর ফলে সমাজে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা ইতালির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। অন্যদিকে, ধর্মীয় পোশাক বিশেষ করে বোরকা ও নেকাবের বিষয়ে ইতালির সরকার যে কোনো ধরনের আপস করবে না, সেটিও মেলোনির বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

 

মুখ ঢেকে রাখার এই প্রথাকে পশ্চিমা মূল্যবোধ এবং নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই মুখ খোলা রেখে আসতে হবে। এটি কেবল নিরাপত্তার জন্যই জরুরি নয়, বরং পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সামাজিকভাবে মেলামেশার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তিনি মন্তব্য করেন যে, ইতালি কখনোই এমন কোনো সংস্কৃতি বা প্রথাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা বা সমর্থন দেবে না, যা একজন কিশোরী বা তরুণীকে জনসমক্ষে তার মুখ ঢেকে চলতে বাধ্য করে বা উৎসাহিত করে।

 

নারী অধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার যুক্তিতে বোরকা নিষিদ্ধের এই প্রস্তাবটি আনা হলেও, মানবাধিকার কর্মী এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ এটিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

 

বর্তমানে ইতালির শিক্ষাব্যবস্থায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি মোটেও নগণ্য নয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির স্কুলগুলোতে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১১ দশমিক ৬ শতাংশই হলো বিদেশি। সহজ কথায়, ইতালির স্কুলগুলোতে প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ১২ জনই এসেছেন অন্য কোনো দেশ থেকে।

 

এই বিপুল সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থীর কারণে ইতালির স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং শিক্ষকদের ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে, সরকার মূলত সেটিকে একটি কাঠামোগত নিয়মের মধ্যে আনতে চাইছে।

 

তবে ভবিষ্যতে স্কুলগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর ভর্তির এই হার ঠিক কত শতাংশে নামিয়ে আনা হবে বা সর্বোচ্চ সীমা কত নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি তার রোববারের ভাষণে কোনো সুনির্দিষ্ট বা স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করেননি। ধারণা করা হচ্ছে, মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতেই এই কোটা নির্ধারণ করা হবে।

 

এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনের মূল কারণ বুঝতে হলে ইতালির বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা এবং মেলোনির দল 'ব্রাদার্স অব ইতালি'-এর আদর্শিক অবস্থান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বস্তুতপক্ষে, সমগ্র ইউরোপ মহাদেশের যেসব দেশে বর্তমানে বৈধ এবং অবৈধ অভিবাসনের হার সবচেয়ে বেশি, সেই তালিকার একেবারে শীর্ষের দিকেই রয়েছে ইতালির নাম।

 

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আসা অসংখ্য অভিবাসীর প্রথম প্রবেশদ্বার হলো ইতালি। এই অভিবাসীদের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ও বৃহৎ অংশ হলো মুসলিম। জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন ব্রাদার্স অব ইতালি একটি কট্টর ডানপন্থি এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত।

 

এই দলটি এবং তাদের বিপুল সংখ্যক কট্টর সমর্থক মনে করেন যে, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন এবং বিশেষ করে মুসলিম অভিবাসীদের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রথা, প্রতীক ও প্রকাশ্য ধর্মাচরণ ইতালির হাজার বছরের প্রাচীন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং খ্রিষ্টান মূল্যবোধের জন্য এক বিরাট হুমকি।

 

ইতালীয় সমাজের এই রক্ষণশীল অংশের ধারণা, অভিবাসীরা যদি স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ভাষাকে ধারণ করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে সামাজিক সংহতি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। তাই সরকার চাইছে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অভিবাসীদের ইতালীয় জীবনযাত্রায় একীভূত হতে বাধ্য করতে।

 

ইউরোপের অন্যান্য দেশ যেমন ফ্রান্স বা বেলজিয়ামেও এর আগে জনসমক্ষে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখ ঢাকা পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এবার ইতালিও সেই একই পথে হাঁটতে শুরু করেছে।

 

একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার যুক্তি, অন্যদিকে অভিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন-এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ইতালির রাজনীতি বর্তমানে এক চরম মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

 

মেলোনির এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে তা কেবল ইতালির অভ্যন্তরীণ সমাজব্যবস্থাতেই নয়, বরং সমগ্র ইউরোপের অভিবাসন নীতির ওপর এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কুল পর্যায়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সীমিত করার এই সিদ্ধান্ত ইউরোপের মানবাধিকার সনদের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে কিনা, তা নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আইনি বিতর্ক তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

 

শিক্ষা একটি সর্বজনীন মৌলিক অধিকার। কোনো শিশুকে কেবল তার জাতীয়তা বা ভাষাগত অদক্ষতার কারণে মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূরে রাখা বা নির্দিষ্ট কোটায় বেঁধে ফেলা কতটা নৈতিক, সে বিষয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে।

 

অনেকেই মনে করছেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভাষা শেখানোর জন্য স্কুলগুলোতে অতিরিক্ত বাজেট ও বিশেষ শিক্ষক নিয়োগ না করে, উল্টো তাদের সংখ্যা কমিয়ে ফেলার নীতি আসলে সমস্যার মূল সমাধান নয়। বরং এটি অভিবাসী পরিবারগুলোকে আরও বেশি প্রান্তিকীকরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

তবে মেলোনি সরকার এসব সমালোচনা আমলে না নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ইশতেহার বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে ইতালির পার্লামেন্টে এবং বিচার বিভাগে এই প্রস্তাবিত আইনগুলো কীভাবে মূল্যায়িত হয়, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে গোটা বিশ্ব।

 

- রয়টার্স