মস্কোয় অনুষ্ঠিত এক নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন রুশ প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব ও ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, এর আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেই ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের মারাত্মক পরিণতির বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও জোরালো সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।
পেসকভ স্পষ্টভাবে জানান যে, বিগত কয়েকমাস ধরে রুশ ভূখণ্ডকে লক্ষ্য করে যে ধরনের সামরিক আগ্রাসন ও হামলা চালানো হয়েছে, তার উপযুক্ত জবাব এবং সুনির্দিষ্ট পরিণতি ইউক্রেনকে ভোগ করতেই হবে।
একই সঙ্গে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী তাদের পূর্বনির্ধারিত বিশেষ সামরিক অভিযান অত্যন্ত অবিচলভাবে অব্যাহত রাখবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে সামরিক কৌশল অনুযায়ী যে সকল লক্ষ্যবস্তুকে যথাযথ বলে বিবেচনা করা হবে, সেগুলোতে নিয়মিত ও সুনির্দিষ্ট আক্রমণ পরিচালনা করা হবে।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় রাশিয়ার জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার প্রসঙ্গ টেনে ক্রেমলিনের মুখপাত্র জানান যে, দেশের অখণ্ডতা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষা করা মস্কোর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও মূল লক্ষ্য।
কিয়েভ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর আগে রুশ ফেডারেশনের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক ও বিধ্বংসী আঘাত হানার যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তা যেকোনো মূল্যে প্রতিহত এবং ভেস্তে দিতে সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর রয়েছে মস্কো।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থেই এই সামরিক পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ব্রিফিংয়ের অন্য একটি অংশে আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে মস্কোর বর্তমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক স্থবিরতা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন পেসকভ।
তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যকার অস্ত্র নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা দীর্ঘকাল ধরে সম্পূর্ণ স্থগিত রয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা যত দ্রুত সম্ভব অবিলম্বে পুনরায় শুরু করা একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, এই সংবেদনশীল ক্ষেত্রে পূর্বের আইনি কাঠামো ও চুক্তিগুলোর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক এবং বর্তমানে তা সম্পূর্ণ শূন্যতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই ধরনের জটিল এবং সংবেদনশীল দ্বিপাক্ষিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনা পুনরায় সচল করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দুরূহ ও দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে বলে সতর্ক করেন রুশ এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
তিনি জানান যে, দুই পরাশক্তির মধ্যকার এই ঐতিহাসিক ও জটিল প্রক্রিয়াটির জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং অত্যন্ত নিখুঁত বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কঠোর আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে, যার ফলে সামগ্রিক এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে যথেষ্ট দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে।
এ সময় আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র আলোচনায় চীনের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে পেসকভ স্পষ্ট করেন যে, বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের সঙ্গে চীনের পারমাণবিক শক্তির পরিমাণগত বা গুণগত কোনো তুলনাই চলে না।
এই বাস্তব কারণেই বেইজিং এই ধরনের আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংলাপে নিজেদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় বা সমীচীন বলে মনে করে না। ক্রেমলিনের মুখপাত্র আরও যোগ করেন যে, এই সুনির্দিষ্ট বিষয়ে চীনের বন্ধুভাবাপন্ন সরকারের পূর্ব কূটনৈতিক অবস্থানে বর্তমান সময়ে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন ঘটেছে বলে মস্কোর কাছে কোনো ধরনের তথ্য নেই।
ব্রিফিংয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যু নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র। বলকান অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র সার্বিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নাটকীয় পরিবর্তন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচের পদত্যাগের বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পেসকভ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, সার্বিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ঐতিহ্যগত ও কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যেকোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষমতার পালাবদলের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক উর্ধ্বে অবস্থান করে।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করেন যে, সার্বিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের এই বহুমুখী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও সুদৃঢ়ভাবে বিকশিত ও সম্প্রসারিত হতে থাকবে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পদত্যাগ বা ক্ষমতার পরিবর্তন দুই দেশের ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার অগ্রযাত্রাকে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না বলেই মস্কো মনে করে।
এই সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এছাড়াও, সাম্প্রতিক সময়ে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঐতিহাসিক ও মুখামুখি বৈঠকের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ক্রেমলিনের মুখপাত্র এটিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলানোর ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত করেন।
উল্লেখ্য যে, বিগত ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের পর এই প্রথম বারের মতো দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কোনো সরাসরি মুখোমুখি কূটনৈতিক বৈঠকে মিলিত হলেন। এই বৈঠকটিকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে পেসকভ জানান যে, এর মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো যুগান্তকারী বা রাতারাতি নাটকীয় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত টেনে নেওয়া ভুল হবে, তবে সুদীর্ঘ বিরতির পর এই ধরনের সরাসরি উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়াটাই সামগ্রিক অর্থে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক।
তিনি দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন যে, যেকোনো পরিস্থিতিতেই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার চেয়ে যেকোনো স্তরে হলেও খোলাখুলি সংলাপ বা আলোচনা বজায় রাখা সবসময়ই অধিকতর ফলপ্রসূ ও মঙ্গলজনক।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান টানাপোড়েন ও চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যখন প্রায় তলানিতে বা শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকে, তখনও পারস্পরিক যোগাযোগ বা যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সচল রাখা কূটনীতির অপরিহার্য শর্ত হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বৈশ্বিক এই পরিস্থিতিতে চঞ্চল ও জটিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থায়ী কোনো কাঠামোগত বা ধারণাগত পরিবর্তন আসার প্রত্যাশা করার সময় এখনো আসেনি বলে তিনি গণমাধ্যমকে সতর্ক করে দেন। তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে চলমান এই নানা মেরুকরণ, সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক সংলাপের বহুমুখী প্রচেষ্টার মাঝে মস্কো তাদের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে বজায় রেখে চলেছে।
ইউক্রেন সংঘটনের দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের এই জটিল সমীকরণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আগামী দিনে এক নতুন ভূরাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।