মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২৬
২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে ভয়াবহ মানবিক সংকট ও দুর্ভিক্ষের চরম শঙ্কা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম

ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে ভয়াবহ মানবিক সংকট ও দুর্ভিক্ষের চরম শঙ্কা
ছবি : Collected

পূর্ব ইউরোপে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা বিপন্ন হতে পারে, তার এক ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ওলেশকি। বর্তমানে রাশিয়ার সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকা এই অঞ্চলে চরম মানবিক সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেখানে আক্ষরিক অর্থেই দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

 

অবরুদ্ধ এই শহরে খাদ্যপণ্য এবং অতি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ প্রায় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। মাইন পোঁতা রাস্তা এবং প্রতিনিয়ত ড্রোন হামলার কারণে সাধারণ নাগরিকদের বাড়ির বাইরে বের হওয়ার পথ অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

 

পাশাপাশি, সংঘাতপূর্ণ এই এলাকা থেকে বেসামরিক মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সমস্ত প্রচলিত ব্যবস্থাও কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুভয় এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে শহরটিতে এখনও প্রায় দুই হাজার বেসামরিক মানুষ আটকা পড়ে আছেন, যাদের মধ্যে অন্তত চল্লিশজন নিষ্পাপ শিশু রয়েছে।

 

শহরটির অবরুদ্ধ বাসিন্দাদের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে যে বার্তাগুলো পাওয়া গেছে, তা থেকে সেখানে বিরাজমান খাদ্য সংকটের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রাণভয়ে গুটিয়ে থাকা এই মানুষগুলো জানিয়েছেন, ঘরের মজুত করা শেষ খাবারটুকু সম্বল করেই তারা কোনোমতে দিন পার করছেন।

 

বেঁচে থাকার এই নিদারুণ সংগ্রামে এক বাসিন্দা জানিয়েছেন যে, সামান্য কিছু বিট, আলু, পেঁয়াজ, জুচিনি, টমেটো এবং বার্লি দিয়ে তিনি শেষবারের মতো তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করেছেন। এরপর তার কাছে আর কোনো রসদ অবশিষ্ট নেই।

 

আরেকজন বাসিন্দা চরম হতাশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, শহরে বাইরে থেকে কোনো ধরনের পণ্য সরবরাহের ন্যূনতম সুযোগ নেই এবং প্রতিনিয়ত মাথার ওপর ঘুরে বেড়ানো প্রাণঘাতী ড্রোন ও গোলাবর্ষণের কারণে চারদিকে কেবল মৃত্যু আর আগুনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।

 

ভৌগোলিক দিক থেকে ওলেশকি শহরটির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি খেরসন অঞ্চলে ডিনিপার নদীর তীরে অবস্থিত। ২০২২ সালের চব্বিশে ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার একদম প্রথম দিনেই রুশ বাহিনী শহরটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।

 

পরবর্তীতে একই বছরের নভেম্বর মাসে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী ব্যাপক আক্রমণের মাধ্যমে নদীর অপর প্রান্তে অবস্থিত খেরসন শহরটি পুনর্দখল করতে সক্ষম হলে, রুশ সেনারা ডিনিপার নদী অতিক্রম করে এই ওলেশকি শহরে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করে।

 

ফলশ্রুতিতে, একসময়ের শান্ত এই জনপদটি রাতারাতি সম্মুখসারির এক ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। গোলাগুলি এবং সামরিক তৎপরতা এখানকার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।

 

বিগত কয়েক বছর ধরে অবরুদ্ধ এই শহরের বাসিন্দারা মূলত আগে থেকে সংরক্ষিত খাবার, বাড়ির আঙিনায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সামান্য ফসল এবং অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে আসা কিছু খাদ্য সরবরাহের ওপর নির্ভর করে কোনোক্রমে টিকে ছিলেন।

 

কিন্তু চলতি বছর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। শহরের প্রবেশের রাস্তাগুলোতে ব্যাপকভাবে মাইন পুঁতে রাখার কারণে এবং আকাশে নিয়মিত সশস্ত্র ড্রোন হামলার কারণে খাদ্যবাহী কোনো গাড়ি প্রবেশ করা কিংবা মানুষকে নিরাপদে বের করে আনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

 

সম্প্রতি অবরুদ্ধ মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহের চেষ্টা করতে গিয়ে একটি গাড়ি মাইনের বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায় এবং বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে সড়কপথে যেকোনো ধরনের সরবরাহ কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

 

শহরের বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে অবরুদ্ধ বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম খাবারটুকুও তারা পাচ্ছেন না। অনেকেই এখন বাধ্য হয়ে দিনে মাত্র একবার খাবার গ্রহণ করে জীবন ধারণ করছেন।

 

ওলেশকির নির্বাসিত মেয়র তেতিয়ানা হাসানেঙ্কো গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক খাদ্যপণ্য যেমন আটা, মাংস, ভোজ্যতেল, চিনি এবং লবণের চরম আকাল দেখা দিয়েছে।

 

খাদ্যের এই তীব্র অভাব মেটাতে কিছু বাসিন্দা পুরোনো শুকনো পাস্তা, নিজেদের বাড়ির আশপাশে অযত্নে জন্মানো সামান্য কিছু সবজি এবং এমনকি বাধ্য হয়ে ভোজ্য আগাছা খেয়ে কোনোমতে শ্বাস টিকিয়ে রেখেছেন।

 

ওলেশকি শহরের সংকট কেবল খাদ্যাভাবেই সীমাবদ্ধ নেই; সেখানকার নাগরিক ও সামাজিক জীবন প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে পুরো শহর বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে।

 

সেখানে নেই কোনো ব্যবহারযোগ্য প্রবাহমান পানি, রান্নার গ্যাস কিংবা ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ। প্রতিনিয়ত গোলাবর্ষণে নিহতদের মরদেহ রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়ার বা সৎকার করার মতো ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে না।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষুধার্ত এবং অনাহারে থাকা পথকুকুরগুলো কখনো কখনো রাস্তায় পড়ে থাকা সেই মৃতদেহগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি অমানবিক এবং বীভৎস করে তুলেছে।

 

এর আগে ২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায়ও ওলেশকি শহরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের পরও শহরের মানুষ কোনোভাবে বাঁচার আশা নিয়ে টিকে ছিলেন।

 

কিন্তু বর্তমানে সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা মাইন এবং আকাশপথে ড্রোনের অব্যাহত নজরদারির কারণে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানো এবং বেসামরিকদের নিরাপদে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া আগের চেয়ে বহুগুণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই চরম মানবিক সংকটের দায়ভার নিয়ে যুদ্ধরত উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাক্যবাণ এবং দোষারোপের রাজনীতি অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এই অবর্ণনীয় সংকটের জন্য সরাসরি রাশিয়াকে দায়ী করেছেন।

 

তাদের অভিযোগ, রুশ বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে শহরের বাসিন্দাদের বের হতে বাধা দিচ্ছে এবং খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা অসহায় মানুষদের ওপর সামরিক চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রতি জরুরি ভিত্তিতে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

 

ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, এখন ড্রোনের ভয়াবহ আগুনের মধ্য দিয়েই চরম ঝুঁকি নিয়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্রেমলিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ওলেশকিতে একটি গুরুতর মানবিক বিপর্যয় বিরাজ করার কথা স্বীকার করলেও এর জন্য সম্পূর্ণভাবে ইউক্রেনকে দায়ী করেছে।

 

রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ পাল্টা দাবি করে বলেছেন যে, ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীই সাধারণ মানুষকে শহর থেকে নিরাপদে বের হতে বাধা দিচ্ছে। উপরন্তু, খাদ্য ও পানীয় জল সরবরাহের মতো মানবিক কাজে ইউক্রেনের ড্রোনগুলোই ইচ্ছাকৃতভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

 

ফলে, এই মানবিক সংকটের প্রকৃত দায় কার, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এবং পরস্পরবিরোধী। উভয় পক্ষের এই দোষারোপের মধ্যেই ইউক্রেন বিকল্প উপায়ে অবরুদ্ধ মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে ওলেশকিতে অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পৌঁছানোর ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী সম্প্রতি আবারও উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করে শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পাঠাতে সক্ষম হয়েছে।

 

ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, মাইন এবং গোলাগুলির কারণে স্থলপথে যেকোনো ধরনের সরবরাহ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ায় ড্রোনই এখন মানুষের প্রাণ বাঁচানোর একমাত্র এবং চূড়ান্ত বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

সার্বিক বিবেচনায়, ওলেশকি শহরের বর্তমান পরিস্থিতি ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৃহত্তর মানবিক সংকটের একটি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রায় চার বছর ধরে চলা এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে সম্মুখসারির একটি শহরে আটকা পড়া সাধারণ মানুষ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা এবং চরম নিরাপত্তার সংকটে পড়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।

 

যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কোনো কার্যকর ও নিরাপদ মানবিক করিডোর এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায়, শহরটির অবশিষ্ট বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং তাদের জন্য নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে জরুরি ও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- রয়টার্স ও আল জাজিরা