প্রায় এক সপ্তাহ পূর্বে দেশটির রাজধানী প্যারিস থেকে সূচিত হওয়া এই ছাত্র বিক্ষোভ এখন আর কেবল সাধারণ দাবি-দাওয়ার মিছিলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র ফরাসি ভূখণ্ডের বিভিন্ন প্রান্তে।
ক্ষুব্ধ ও সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদী অবস্থানকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় ব্যাপক সহিংস সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি গভীর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার সারা দেশে প্রায় চারশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
রাষ্ট্রের প্রধান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সরকারের চরম উদাসীনতা এবং বাজেট কাটছাঁটের বিতর্কিত নীতিকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়া হাজার হাজার কিশোর-কিশোরীদের এই অভূতপূর্ব আন্দোলন এখন কেবল রাজপথের আন্দোলন হিসেবেই থাকছে না, বরং তা দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক কাঠামোর জন্য এক বিশাল পরীক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন খ্যাতনামা বার্তা সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থি প্রশাসন যখন এই নজিরবিহীন ও ক্ষিপ্র গতিতে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন দমন করার জন্য কঠোর থেকে কঠোরতর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, ঠিক তখনই ফ্রান্সের প্রধান শহরগুলোর রাজপথ প্রায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
দেশের পূর্বাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর সার্সবার্গে সুনির্দিষ্ট দাবিতে রাজপথে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে দাঙ্গা পুলিশ একযোগে বিপুল পরিমাণ কাঁদান গ্যাস নিক্ষেপ করে, যার ফলে সমগ্র এলাকা এক ভীতিকর ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
একই দিনে দক্ষিণাঞ্চলীয় বিখ্যাত বন্দর নগরী মার্সেইতে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা পুলিশি ব্যারিকেড ও নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ্য করে ফায়ারওয়ার্কস ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর রেঁসে বিক্ষোভকারীরা সড়কের ওপর থাকা ময়লার গাড়িতে সরাসরি আগুন ধরিয়ে দিয়ে নিজেদের গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং শহরের প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
একই সঙ্গে রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রস্থলেও দিনভর থেমে থেমে তীব্র সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া প্রত্যক্ষ করা গেছে, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী হাতে নানা ধরনের বৈষম্যবিরোধী ও অধিকার আদায়ের স্পষ্ট প্ল্যাকার্ড তুলে ধরে সরকারের শিক্ষা সংক্রান্ত নীতি এবং অর্থ ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে।
শিক্ষা ও সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া এই ব্যাপক জনরোষের মূল উৎস নিহিত রয়েছে দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত হয়ে থাকা নানাবিধ সংকট এবং সাম্প্রতিক সরকারি বাজেটে শিক্ষাখাতে বড় ধরনের অর্থ কাটছাঁটের সিদ্ধান্তের মধ্যে।
রাজপথে নেমে আসা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে প্রধান এবং মৌলিক অভিযোগ হলো, প্রয়োজনীয় সরকারি অনুদান ও অর্থায়নের অভাবেই তাদের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
এমনকি রাজধানী ও অন্যান্য প্রধান শহরের নামীদামি হাইস্কুলগুলোতেও শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলেও তাদের বসার জন্য পর্যাপ্ত বেঞ্চ বা আসনের ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুও নেই।
একটি সঠিক ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ সম্পূর্ণ বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞানাগারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত উপকরণ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকের চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছে যে, শিক্ষার মতো একটি অপরিহার্য মৌলিক অধিকারকে সংকুচিত করে সরকারি কোষাগারের অর্থ সাশ্রয় করার সিদ্ধান্ত কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তারা অতি দ্রুত শিক্ষাখাতে সরকারি বাজেট বৃদ্ধি করা, সকল শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের শিক্ষা সরঞ্জাম অবিলম্বে সরবরাহের জোরালো দাবি জানাচ্ছে।
গত সপ্তাহে প্যারিসের রাজপথে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সূচিত হওয়া এই শিক্ষার্থী প্রতিবাদ আন্দোলন সময়ের পরিক্রমায় একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনায় চরম রূপ লাভ করলে দেশটির স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ প্রশাসন দেশজুড়ে কঠোর ধরপাকড় অভিযান শুরু করে।
বিগত মাত্র সাত দিনের প্রশাসনিক অভিযানে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর ও জনপদ থেকে প্রায় দুই হাজার আন্দোলনকারী বিক্ষোভকারীকে পুলিশ আটক করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে গেছে, যাদের এক বিশাল অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর ও তরুণ শিক্ষার্থী।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই নজিরবিহীন অবনতি এবং রাজপথে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর মন্ত্রিসভা।
এই উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন একটি প্রধান জাতীয় সংবাদ মাধ্যমকে প্রদত্ত বিশেষ সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, রাজপথে এই ধরনের সহিংসতা, অগ্নিকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ধ্বংসাত্মক ক্ষয়ক্ষতির জন্য যারা দায়ী, আটককৃত সেইসব কিশোর-কিশোরী ও শিক্ষার্থীদের পিতামাতার কাছ থেকেই আইনগতভাবে সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায় করা উচিত।
অপরদিকে, দেশের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি কিছুটা প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে এবং অল্পবয়সী শিক্ষার্থীদের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি মাথায় রেখে ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এডোয়ার্ড জেফরে সকল অভিভাবকদের প্রতি এক বিশেষ মানবিক ও আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে জোর দিয়ে বলেন যেন তারা কোনো অবস্থাতেই নিজেদের সন্তানদের এই সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে ঘরের বাইরে বা রাজপথের বিপজ্জনক উত্তাল আন্দোলনে অংশ নিতে না দেন।
ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা এবং সার্বিক সামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের এই বিশাল আন্দোলন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সংকটময় রাজনৈতিক মুহূর্তে দেখা দিয়েছে।
ইউরোপের অত্যন্ত প্রভাবশালী এই রাষ্ট্রটিতে আগামী আর মাত্র ছয় মাস পরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এমন এক জটিল ও গুরুত্ববহ সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর বিভিন্ন রাজনৈতিক জরিপ ও জনমত সমীক্ষায় এটি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে যে, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থি সরকারের সামগ্রিক জনপ্রিয়তার হার ক্রমেই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে সরকার যখন রাষ্ট্রীয় খরচে বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের নীতি গ্রহণ করে, তখন তার সরাসরি নেতিবাচক কোপ এসে পড়ে দেশের সাধারণ শিক্ষাখাতের ওপর।
সরকারি অনুদান কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়গুলোতে চরম সম্পদ সংকট তৈরি হয়, যা তরুণদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে এই গণবিক্ষোভ সরকারবিরোধী দলগুলোর হাতে বড় অস্ত্র তুলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ফ্রান্সের ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অত্যন্ত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে বর্তমানের পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো না বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের আসন সংকটকে দীর্ঘায়িত করায় সরকারের যে উদাসীন অবস্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা কোনোভাবেই একটি উন্নত ও সভ্য দেশের শিক্ষানীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।
শত শত হাইস্কুলের হাজার হাজার শিক্ষার্থী যখন পড়ালেখা ছেড়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হয় এবং নিজেদের সামান্য বেঞ্চ ও খাতা-কলমের দাবির জন্য কাঁদানে গ্যাসের সম্মুখীন হয়, তখন সেটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও সামাজিক দায়িত্বের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে।
দেশের সুশীল সমাজও মনে করে যে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পুলিশ দিয়ে এই কিশোর-কিশোরীদের প্রতিবাদকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া কখনই সম্ভব হবে না, বরং এতে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ আরও ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করতে পারে।
সার্বিকভাবে বিচার করলে, ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই উত্তাল শিক্ষার্থী আন্দোলন আজ কেবল একটি সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধের জায়গায় নেই, বরং তা বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট গণসংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশটির প্রায় চারশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী আটক হওয়া এবং প্রধান শহরগুলোতে চলমান সহিংসতার দৃশ্য এটিই প্রমাণ করে যে, শুধুমাত্র আইনি ব্যবস্থা বা বাবা-মায়ের ওপর জরিমানা ধার্য করার হুমকি দিয়ে এই সংকটের নিরসন সম্ভব নয়।
শিক্ষাখাতে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধি, জীর্ণ শ্রেণিকক্ষগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আন্দোলনকারী তরুণদের সাথে একটি আন্তরিক ও দ্বিপাক্ষিক সংলাপে বসার মাধ্যমেই এই দীর্ঘায়িত অস্থিরতার অবসান ঘটতে পারে।
আগামী দিনের নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকার কীভাবে এই তরুণ সমাজের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে প্রশমিত করে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা।