ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ইতোমধ্যে নকআউট পর্বের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের সময়সূচি চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করেছে। আগামী ২৯ জুন দিবাগত রাত থেকে ফুটবল বিশ্ব সাক্ষী হতে যাচ্ছে সেরা বত্রিশ থেকে সেরা ষোলোতে জায়গা করে নেওয়ার এই 'ডু অর ডাই' বা বাঁচা-মরার জমজমাট লড়াইয়ের।
এই পর্বে প্রতিটি দলই নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে মাঠে নামবে, কারণ এখানে হার মানেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় আর জয় মানেই পরম আরাধ্য শিরোপার দিকে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়া। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিশ্বকাপের এই দ্বিতীয় রাউন্ড আগের যেকোনো আসরের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে।
কারণ, আধুনিক ফুটবলে ছোট-বড় দলের মধ্যকার পার্থক্য অনেকটাই কমে এসেছে এবং প্রতিটি দলই এখন উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে নিজেদের প্রস্তুত করে। সেরা বত্রিশ দলের এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামতে যাচ্ছে এবারের আসরের অন্যতম আয়োজক দেশ কানাডা এবং আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল দক্ষিণ আফ্রিকা।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত বিশ্বমানের সোফি স্টেডিয়ামে। আয়োজক দেশ হিসেবে কানাডার ওপর যেমন দর্শকদের বিশাল প্রত্যাশার চাপ থাকবে, তেমনি দক্ষিণ আফ্রিকাও চাইবে নিজেদের সেরা খেলাটি উপহার দিয়ে পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত করতে।
আন্তর্জাতিক মানের এই ম্যাচটি পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরো। তার বাঁশির শব্দেই শুরু হবে নকআউট পর্বের এই মহাযজ্ঞ। নকআউট পর্বের চাপ সামলে স্বাগতিকরা নিজেদের দর্শকদের সামনে কতটা জ্বলে উঠতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
একই দিনে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও একটি হাইভোল্টেজ ম্যাচ, যেখানে মুখোমুখি হবে লাতিন আমেরিকার ফুটবল জাদুকর ও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং এশিয়ান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি জাপান। সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের নজর থাকবে এই মহারণের দিকে।
একদিকে ব্রাজিলের নান্দনিক আক্রমণাত্মক ফুটবল, অন্যদিকে জাপানের শৃঙ্খলাবদ্ধ ও গতির সমন্বয়-সব মিলিয়ে ম্যাচটি যে চরম উত্তেজনাপূর্ণ হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ব ফুটবলের এই ধ্রুপদী লড়াইটি অনুষ্ঠিত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে।
বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী আগামী ২৯ জুন রাত ১১টায় সরাসরি সম্প্রচারিত হবে এই ম্যাচ। অতীত পরিসংখ্যান ও শক্তির বিচারে ব্রাজিল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার দলগুলোর অভাবনীয় উত্থান এই ম্যাচকে ঘিরে বাড়তি উন্মাদনা তৈরি করেছে।
জাপানের জমাট রক্ষণভাগ ভেদ করে ব্রাজিলের ফরোয়ার্ডরা কীভাবে গোলের দেখা পান, সেটিই হবে এই ম্যাচের মূল আকর্ষণ। ব্রাজিল ও জাপানের এই শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই পরের দিন ফুটবল বিশ্ব দেখতে পাবে আরও একটি দুর্দান্ত ম্যাচ।
সেরা ষোলোতে ওঠার এই কঠিন সমীকরণে এবার মাঠে নামবে গত বিশ্বকাপের চমক জাগানো আফ্রিকান দেশ মরক্কো এবং ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী ও ঐতিহ্যবাহী দল নেদারল্যান্ডস। কৌশল এবং শক্তির বিচারে দুই দলই প্রায় সমানে সমান।
বোস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচটি আগামী ৩০ জুন বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় শুরু হবে। ইউরোপীয় ঘরানার পাসিং ফুটবলের সঙ্গে আফ্রিকান গতির এই লড়াই দর্শকদের এক অনন্য ফুটবলীয় অভিজ্ঞতা প্রদান করবে বলে ক্রীড়া বোদ্ধারা গভীরভাবে বিশ্বাস করছেন।
ডাচদের সুশৃঙ্খল আক্রমণভাগের বিপরীতে মরক্কোর রক্ষণভাগের দৃঢ়তা ম্যাচটিকে একটি কৌশলগত মাস্টারক্লাসে পরিণত করতে পারে। এদিকে, ফিফার প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী দ্বিতীয় রাউন্ডের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের সময় চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এবারের ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান আয়োজক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘরের মাঠে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে ইউরোপের দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে। নিজেদের মাটিতে চেনা পরিবেশে দর্শকদের বিপুল সমর্থন কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চাইবে কাঙ্ক্ষিত জয় ছিনিয়ে আনতে।
অন্যদিকে, বসনিয়াও আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। আগামী ২ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারাতে অনুষ্ঠিত হবে এই রোমাঞ্চকর ম্যাচটি। স্বাগতিক দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকার ও সমর্থন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়দের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে সন্দেহ নেই।
ইতোমধ্যেই নকআউট পর্বের এই চারটি ম্যাচের সময়সূচি চূড়ান্ত হলেও, এই রাউন্ডের বাকি বারোটি ম্যাচের সূচি এখনও অপেক্ষমাণ রয়েছে। গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আনুষ্ঠানিকভাবে সেই সময়সূচিও ঘোষণা করবে ফিফা।
নকআউট পর্বের নিয়ম অনুযায়ী, এই রাউন্ডে কোনো ম্যাচ ড্র হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। নির্ধারিত নব্বই মিনিটের খেলায় যদি কোনো ফলাফল না আসে, তবে অতিরিক্ত সময়ের খেলা অনুষ্ঠিত হবে। আর সেখানেও যদি ম্যাচ অমিমাংসিত থাকে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে স্নায়ুক্ষয়ী পেনাল্টি শুটআউটের মাধ্যমে।
ফুটবলের এই নির্মম অথচ সুন্দর নিয়মে জয়ী দল উল্লাসে মেতে উঠবে পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট পেয়ে, আর পরাজিত দলকে একরাশ হতাশা নিয়ে চোখের জলে চিরতরে বিদায় নিতে হবে স্বপ্নের বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকে। প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি পাস এবং প্রতিটি গোল এখন হয়ে উঠবে ফুটবল ইতিহাসের অংশ।