মাত্র ১৩টি দল নিয়ে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট ও সীমিত আয়োজন আজ কালের বিবর্তনে ৪৮টি দলের একটি সুবিশাল মেগা ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। বিগত প্রায় এক শতাব্দী ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই কাঠামোগত, প্রযুক্তিগত এবং ভৌগোলিক রূপান্তর কেবল অবিশ্বাস্যই নয়, বরং তা মানব সভ্যতার আধুনিকায়ন ও বিশ্বায়নের এক অনন্য দলিল।
প্রথম বিশ্বকাপের সেই সাদামাটা আয়োজনের সঙ্গে চলতি মেগা বিশ্বকাপের তুলনা করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ফুটবল খেলাটি সময়ের সাথে সাথে কতটা আমূল বদলে গেছে। ফুটবল ইতিহাসের সেই প্রথম আসরে দলগুলোর অংশগ্রহণের জন্য আজকের মতো কোনো দীর্ঘ ও কঠিন বাছাইপর্বের মধ্য দিয়ে যেতে হতো না।
তখন ফিফার বিশেষ আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে কেবল ১৩টি দেশ উরুগুয়ের সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে সে সময় মাত্র চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল এবং পুরো টুর্নামেন্টে সর্বমোট ম্যাচের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭টি।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক ফুটবলের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৬ সালের চলতি আসরে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেকর্ডসংখ্যক ৪৮টি শক্তিশালী দল মূল পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। দলগুলোকে এবার মোট ১২টি গ্রুপে বিভক্ত করা হয়েছে এবং টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এবারই প্রথম প্রবর্তিত হয়েছে রাউন্ড অব ৩২ বা সেরা বত্রিশের নকআউট পর্ব।
দলের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবেই টুর্নামেন্টের মোট ম্যাচের সংখ্যাও আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪টিতে, যা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী রোমাঞ্চের খোরাক জোগাচ্ছে। শুধু দলের সংখ্যা বা ম্যাচের সূচিই নয়, আয়োজক দেশের ধারণাতেও এসেছে এক বিশাল বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের একক আয়োজক ছিল উরুগুয়ে এবং পুরো টুর্নামেন্টের সবকটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল কেবল একটিমাত্র শহরের তিনটি সাধারণ স্টেডিয়ামে। দীর্ঘ ৯৬ বছর পর বর্তমানের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি ফুটবল ইতিহাসের প্রথম এমন একটি আসর যা যৌথভাবে তিনটি বৃহৎ দেশ-যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা একসাথে আয়োজন করছে।
উত্তর আমেরিকার এই তিনটি দেশের ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন শহরের অত্যাধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামে ভাগ করে ম্যাচগুলো অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান পরিবর্তনটি এসেছে খেলোয়াড়দের যাতায়াত ব্যবস্থা, সুযোগ-সুবিধা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে।
১৯৩০ সালের প্রথম আসরে অংশ নিতে ইউরোপীয় অঞ্চলের দলগুলোকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে জাহাজে চড়ে প্রায় দুই সপ্তাহের এক ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে উরুগুয়ে পৌঁছাতে হয়েছিল। সে সময় খেলাধুলার কোনো সরাসরি সম্প্রচার কিংবা আধুনিক গণমাধ্যমের জোরালো কভারেজের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না।
অথচ বর্তমান যুগে খেলোয়াড়রা অত্যন্ত বিলাসবহুল চার্টার্ড ফ্লাইটে চড়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এক ভেন্যু থেকে অন্য ভেন্যুতে যাতায়াত করছেন। মাঠের ভেতরে রেফারিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিখুঁত ও বিতর্কহীন করতে এখন যুক্ত হয়েছে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি এবং চিপযুক্ত স্মার্ট বল, যা প্রতিটি সেকেন্ডের নিখুঁত তথ্য সরবরাহ করছে।
খেলার মূল উপকরণ অর্থাৎ বল এবং মাঠের আধুনিকায়নও চোখ ধাঁধানো। প্রথম বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের খেলতে হতো চামড়ার তৈরি অত্যন্ত ভারী ‘তিয়েন্তো’ ও ‘টি-মডেল’ বল দিয়ে, যা বৃষ্টির পানি শুষে নিলে ওজনে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেত এবং খেলোয়াড়দের জন্য তা নিয়ন্ত্রণ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের এই আধুনিক বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের পায়ে শোভা পাচ্ছে উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ও বায়ুগতিবিদ্যার দিক থেকে শতভাগ নিখুঁত ও হালকা বল। তখনকার কর্দমাক্ত বা সাধারণ প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠের জায়গা এখন পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে হাইব্রিড ঘাস এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত আধুনিক স্টেডিয়ামগুলো।
১৯৩০ সালে উরুগুয়ে যখন ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেছিল, তখন ফুটবল ছিল মূলত ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি আঞ্চলিক লড়াই।
তবে ৯৬ বছর পর আজ ২০২৬ সালে এসে এশিয়া, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দলগুলোর ব্যাপক ও শক্তিশালী অংশগ্রহণ এই টুর্নামেন্টকে সত্যিকার অর্থেই একটি সর্বজনীন বৈশ্বিক উৎসবে রূপ দিয়েছে।
অতীতের সেই ১৩টি দলের ক্ষুদ্র আয়োজন থেকে আজকের ৪৮ দলের এই মেগা আসরের রূপান্তর প্রমাণ করে যে, ফুটবল কেবল একটি খেলাই নয়, বরং তা আজ বিশ্ববাসীকে এক সুতোয় বাঁধার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।