‘জে’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম দুটি ম্যাচেই টানা জয় লাভ করার মাধ্যমে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষস্থানটি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। গ্রুপ পর্বের অন্য দুটি দল আলজেরিয়া এবং অস্ট্রিয়া যদি তাদের শেষ ম্যাচে জয়ও লাভ করে, তবুও গোল ব্যবধান এবং পারস্পরিক লড়াইয়ের সমীকরণে তারা কোনোভাবেই আর্জেন্টিনাকে টপকে শীর্ষে যেতে পারবে না।
অন্যদিকে, টানা ব্যর্থতার গণ্ডিতে আটকে থেকে এই টুর্নামেন্ট থেকে ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ বিদায় নিয়েছে এশিয়ার দেশ জর্ডান। এমন একটি পরিস্থিতিতে রাউন্ড অব ৩২ অর্থাৎ সেরা বত্রিশের নকআউট পর্বে লিওনেল মেসিদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আসলে কোন দেশ মাঠে নামছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমী ও ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা-কাকতালীয় হিসাব-নিকাশ।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল যদি নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন বা সেরা দল হিসেবে নকআউট পর্বে উন্নীত হয়, তবে তাদের মুখোমুখি হতে হবে ‘এইচ’ গ্রুপের রানার্সআপ বা দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলটির।
বর্তমানে এই ‘এইচ’ গ্রুপের সমীকরণটি অত্যন্ত চমৎকার ও রোমাঞ্চকর অবস্থায় রয়েছে, যেখানে অবস্থান করছে ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন, লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী দল উরুগুয়ে, আফ্রিকার উদীয়মান দেশ কেপ ভার্দে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবল শক্তি সৌদি আরব।
এই গ্রুপের শেষ রাউন্ডের সূচিতে ফুটবল বিশ্বের দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে, অন্যদিকে অন্য একটি ম্যাচে সৌদি আরবের মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে।
এই দুটি ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপরই সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে যে, নকআউট পর্বের প্রথম ধাপে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার কঠিন দায়িত্বটি কোন দলের কাঁধে গিয়ে পড়ছে। যদি উরুগুয়ে তাদের শেষ ম্যাচে স্পেনকে পরাজিত করতে সক্ষম হয় এবং অন্য ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে সৌদি আরবের মধ্যকার লড়াইটি ড্র হয়, তবে পয়েন্টের সমীকরণে স্পেন রানার্সআপ হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে থেকে নকআউট পর্বে উন্নীত হবে এবং আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে।
আবার উরুগুয়ে যদি স্পেনকে পরাজিত করে এবং অন্য ম্যাচে সৌদি আরব কেপ ভার্দেকে হারিয়ে দেয়, তাহলেও একই সমীকরণে স্পেনই গ্রুপে দ্বিতীয় দল হিসেবে পরবর্তী রাউন্ডে চলে যাবে। এর বাইরে আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দেরও আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হওয়ার একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা দৃশ্যমান রয়েছে।
যদি স্পেন তাদের শেষ ম্যাচে উরুগুয়েকে পরাস্ত করে এবং একই সাথে কেপ ভার্দে যদি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পূর্ণ পয়েন্ট তুলে নিতে পারে, তবে স্পেন গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন এবং কেপ ভার্দে গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবে।
এমনকি স্পেন উরুগুয়েকে হারানোর পর যদি কেপ ভার্দে ও সৌদি আরবের ম্যাচটি ড্রয়ে পরিণত হয়, তাহলেও কেপ ভার্দেই দ্বিতীয় দল হিসেবে নকআউটে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার গৌরব অর্জন করবে।
অন্য এক রোমাঞ্চকর সমীকরণে সৌদি আরও একবার আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যা ফুটবলপ্রেমীদের মনে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর উদ্বোধনী ম্যাচের স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে।
যদি স্পেন উরুগুয়েকে পরাজিত করে এবং একই সাথে সৌদি আরব কেপ ভার্দেকে হারিয়ে দেয়, তবে সৌদি আরব গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট পাবে। আবার স্পেন ও উরুগুয়ের মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচটি যদি ড্র হয় এবং অন্যদিকে সৌদি আরব যদি কেপ ভার্দেকে পরাজিত করতে পারে, তাহলেও সমীকরণটি একই থাকবে এবং গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে সৌদি আরবের সঙ্গে মেসিদের আরও একটি ঐতিহাসিক দ্বৈরথ দেখার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এই হিসাবের বাইরে উরুগুয়েও আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হতে পারে, যদি কিছু সূক্ষ্ম গাণিতিক সমীকরণ মিলে যায়। উরুগুয়ে এবং কেপ ভার্দে-এই উভয় দলই যদি নিজ নিজ শেষ ম্যাচে জয়লাভ করতে সফল হয়, তবে গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান বা রানার্সআপ নির্ধারণের জন্য ফিফার গোল ব্যবধানের নিয়মটি সামনে চলে আসবে।
এই দুই দলের মধ্যে যার গোল ব্যবধান কম থাকবে, তারাই রানার্সআপ হিসেবে আর্জেন্টিনার সামনে পড়বে। বর্তমানে এই দুই দলেরই গোল ব্যবধান শূন্য এবং গোল করার সংখ্যাও সমান, অর্থাৎ উভয় দলই এখন পর্যন্ত দুটি করে গোল করতে পেরেছে।
যদি শেষ ম্যাচগুলোর পরেও এই সমতা বজায় থাকে, তবে ‘ফেয়ার প্লে’ বা ম্যাচ চলাকালীন খেলোয়াড়দের দেখা হলুদ ও লাল কার্ডের হিসাব বিবেচনা করা হবে। এই নিয়মের দিক থেকে কেপ ভার্দের চেয়ে একটি হলুদ কার্ড কম দেখে এখন পর্যন্ত উরুগুয়ে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে এগিয়ে রয়েছে।
আবার যদি গ্রুপের শেষ দুটি ম্যাচই ড্রয়ের মাধ্যমে শেষ হয়, তাহলেও উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দের মধ্যে গোল পার্থক্য, গোল সংখ্যা, ফেয়ার প্লে এবং সবশেষে ফিফা র্যাঙ্কিং বিবেচনা করে গ্রুপ রানার্সআপ নির্ধারণ করা হবে।
বর্তমান পয়েন্ট টেবিলের সামগ্রিক চিত্র এবং দলগুলোর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনা করে ক্রীড়া বিশ্লেষকদের অনেকেই কেপ ভার্দেকেই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছেন। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়, বিশেষ করে যখন শেষ রাউন্ডের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ একই সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
ভোজিনহার দূরদর্শী নেতৃত্বে কেপ ভার্দে যদি সৌদি আরবকে হারাতে পারে, তবে আফ্রিকার এই ছোট দেশটি ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে পারে। অপরদিকে, উরুগুয়ে যদি স্পেনের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে দিতে পারে, তবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হিসেবে স্পেনই হয়ে যেতে পারে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ।
ফলে আগামী শনিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গ্রুপ ‘এইচ’-এর এই শেষ দুটি ম্যাচ বিশ্ব ফুটবলের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এবং বিশেষ করে আর্জেন্টিনার পরবর্তী যাত্রার জন্য এক অপরিসীম গুরুত্ব ও উত্তেজনা বহন করছে।