ইতোমধ্যে আটটি গ্রুপের চূড়ান্ত লড়াই সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট চারটি গ্রুপের সমীকরণ মেলাতে মাঠে নামছে দলগুলো। শনিবার সকালে ‘এইচ’ গ্রুপের রোমাঞ্চকর লড়াই শেষে বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব অর্থাৎ ‘রাউন্ড অব থার্টি টু’ বা শেষ বত্রিশে নিজেদের স্থান পাকা করেছে পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, ঘানা, মিশর এবং প্যারাগুয়ে।
নিজেদের গ্রুপের একটি করে ম্যাচ বাকি থাকলেও গাণিতিক সমীকরণে আগেই পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত করেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও হ্যারি কেইনদের মতো বিশ্বমানের তারকাদের দল। আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে এমন দ্রুত পটপরিবর্তন বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
‘এইচ’ গ্রুপের চূড়ান্ত লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় অঘটনটি ঘটেছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এবং এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি সৌদি আরবের করুণ বিদায়ের মধ্য দিয়ে। এই গ্রুপ থেকে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট রাউন্ডে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল স্পেন।
স্পেনের সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ ও ক্ষুরধার আক্রমণভাগের কাছে পরাস্ত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার চরম তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে যাদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অতীত, তাদের এমন আকস্মিক বিদায় বিশ্বজুড়ে অগণিত ফুটবল ভক্তকে গভীরভাবে হতাশ করেছে।
অন্যদিকে, একই গ্রুপের আরেক ম্যাচে আফ্রিকান দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই করেও গোলশূন্য ড্রয়ের কারণে বিশ্বকাপ আসর থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে সৌদি আরব। তবে এই গ্রুপের সবচেয়ে চমকপ্রদ ইতিহাস রচনা করেছে কেপ ভার্দে।
নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফুটবলের এই বিশ্বমঞ্চে অংশ নিয়েই গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিয়েছে তারা, যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে এক নতুন রূপকথার জন্ম দিয়েছে।
মূলত ‘এইচ’ গ্রুপের এই চূড়ান্ত ফলাফল এবং পয়েন্টের হিসাবের ওপর ভিত্তি করেই অন্য গ্রুপগুলোতে ন্যূনতম চার পয়েন্ট অর্জন করা পাঁচটি দেশের নকআউট পর্ব গাণিতিকভাবে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে যায়। এই দলগুলোর মধ্যে লাতিন আমেরিকার লড়াকু প্রতিনিধি প্যারাগুয়ে ইতোমধ্যে গ্রুপ পর্বে তাদের নির্ধারিত তিনটি ম্যাচই সম্পন্ন করেছে।
‘ডি’ গ্রুপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্যারাগুয়ে চার পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। গ্রুপের শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করার মাধ্যমে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট অর্জন করে।
একই পয়েন্ট নিয়েও গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকার কারণে অস্ট্রেলিয়া আগেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছিল। আর এই ‘ডি’ গ্রুপের শীর্ষে অবস্থান করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরবর্তী রাউন্ডে পা রেখেছে টুর্নামেন্টের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র।
প্যারাগুয়ে বাদে শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করা অপর চারটি দল-ইউরোপের শক্তিশালী ইংল্যান্ড ও পর্তুগাল এবং আফ্রিকার পরাশক্তি ঘানা ও মিশরের সামনে এখনও গ্রুপ পর্বে একটি করে ম্যাচ বাকি রয়েছে। গ্রুপ পর্বের নিজেদের শেষ ম্যাচে মাঠে নামার আগেই এই চার দল চার পয়েন্ট করে সংগ্রহ করে গাণিতিক হিসেবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে গেছে।
বর্তমানে তারা সেরা তৃতীয় স্থানের দলের কোটায় নকআউট পর্বে ওঠার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে নিজেদের শেষ ম্যাচে মাঠে নেমে এই সমীকরণ নিজেদের পক্ষে আরও ভালোভাবে পরিবর্তন করার দারুণ সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে।
পর্তুগাল বা ইংল্যান্ডের মতো তারকাখচিত দলগুলো যদি তাদের শেষ ম্যাচে নিদেনপক্ষে একটি ড্র-ও আদায় করে নিতে পারে, তবে তাদের নিজস্ব গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ হওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে।
এমনকি কোনো কারণে যদি তারা নিজেদের শেষ ম্যাচে অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজয়ের সম্মুখীনও হয়, তবুও তাদের নকআউট পর্বে খেলার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। কারণ, নতুন নিয়মে তাদের অর্জিত চার পয়েন্টই পরবর্তী রাউন্ডে পদার্পণ করার জন্য সম্পূর্ণ যথেষ্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিশ্বকাপের বর্ধিত এই নতুন কাঠামোর কারণে অনেক দলের ভাগ্যই এখন সুতোর ওপর ঝুলছে। নকআউট পর্বে ওঠার দৌড়ে চার পয়েন্টের নিচে অবস্থান করা একাধিক দলকে এখন অন্যান্য গ্রুপের শেষ ম্যাচের ফলাফলের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে।
তিন বা এর চেয়েও কম পয়েন্ট নিয়ে পরবর্তী রাউন্ডের আশায় প্রহর গুনছে এশিয়ার অন্যতম প্রতিনিধি দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপের স্কটল্যান্ড এবং আফ্রিকার শক্তিশালী দল সেনেগাল। প্রথম রাউন্ডের খেলা প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে আসায় এই দলগুলোর চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার।
তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের সর্বসম্মত মতে, এবারের আসরে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে কেপ ভার্দে। মাত্র তিন পয়েন্ট অর্জন করেও রানার্সআপ হিসেবে তাদের নকআউট পর্বে পৌঁছানো প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে যেকোনো দলই অদম্য সাহস ও কৌশল নিয়ে লড়াই করলে ইতিহাস বদলে দিতে পারে। সব মিলিয়ে এবারের ৪৮ দলের বিশ্বকাপ ফুটবল ভক্তদের প্রতিনিয়ত নতুন সমীকরণ এবং শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত উপহার দিচ্ছে, যা টুর্নামেন্টের সৌন্দর্যকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।