তবে শেফিল্ডের এই পরাজয়ের চেয়েও ফুটবল অঙ্গনে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য এবং বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর লাল কার্ড দেখার বিষয়টি। খেলার প্রথমার্ধেই পরপর দুটি হলুদ কার্ড দেখে তাকে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়, যা মূলত পুরো ম্যাচের গতিপথকে স্বাগতিকদের অনুকূলে ঘুরিয়ে দেয়।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত লাল কার্ডের কারণে আগামী ম্যাচে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়কে ছাড়াই মাঠে নামার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে শেফিল্ড ইউনাইটেডকে। পোর্টসমাউথের নিজস্ব মাঠ ফ্রাটন পার্কে শুরু থেকেই উভয় দলের মধ্যে এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক আবহ বিরাজ করছিল।
চ্যাম্পিয়নশিপের এই লড়াইয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে শেফিল্ড ইউনাইটেড এবং পোর্টসমাউথ-উভয় দলই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসে। তবে ম্যাচের উত্তেজনা ক্রমশ শারীরিক লড়াইয়ে রূপ নিতে শুরু করে। খেলার ঠিক ৩৩ মিনিটের মাথায় মাঠে প্রথম বড় ধরনের সতর্কবার্তার মুখোমুখি হন হামজা চৌধুরী।
পোর্টসমাউথের আক্রমণভাগের খেলোয়াড় রায়ান কাভুমা ম্যাককুইনকে অবৈধভাবে বাধা দেওয়ার কারণে বা ফাউল করার অপরাধে রেফারি তাকে প্রথম হলুদ কার্ডটি প্রদর্শন করেন। পেশাদার ফুটবলে এমন কৌশলগত বাধা প্রদানের কারণে রেফারিদের হলুদ কার্ড দেখানো অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হয় এবং এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে মাঠে বা মাঠের বাইরে কোনো পক্ষ থেকেই তেমন কোনো বিতর্কের সৃষ্টি হয়নি।
কিন্তু ফুটবল মাঠে পরিস্থিতি বদলে যেতে বা নাটকীয় মোড় নিতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। প্রথম হলুদ কার্ড দেখার ঠিক দশ মিনিট পর, অর্থাৎ প্রথমার্ধের ৪৩ মিনিটের মাথায় এক চরম বিতর্কিত এবং দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন হামজা চৌধুরী।
আবারও সেই একই খেলোয়াড়, রায়ান কাভুমার সাথে বল দখলের এক তীব্র লড়াইয়ে বা চ্যালেঞ্জে অবতীর্ণ হন তিনি। কাভুমা অত্যন্ত চতুরতার সাথে হামজা চৌধুরীর পায়ের ফাঁক দিয়ে বলটি বের করে নিয়ে সামনের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে হামজা চৌধুরীর সাথে তার শারীরিক ধাক্কা লাগে এবং কাভুমা তৎক্ষণাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মাঠের রেফারি পুনরায় বাঁশি বাজান এবং হামজাকে তার দ্বিতীয় হলুদ কার্ডটি প্রদর্শন করেন।
যেহেতু ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী এক ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড দেখার অর্থ হলো স্বয়ংক্রিয় লাল কার্ড, তাই হামজা চৌধুরীকে তাৎক্ষণিকভাবে মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে যেতে হয়।
প্রথম হলুদ কার্ডের সিদ্ধান্তটি সর্বজনস্বীকৃত হলেও, দ্বিতীয় হলুদ কার্ড প্রদর্শনের এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফুটবল বিশ্লেষক এবং শেফিল্ড ইউনাইটেডের সমর্থকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অনেকের মতেই, এটি একটি সাধারণ শারীরিক সংঘর্ষ বা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা ছিল, যার জন্য সরাসরি দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখানোটা রেফারির জন্য একটি অত্যন্ত কঠোর বা অতিমাত্রায় রক্ষণশীল সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে মাঠে রেফারির সিদ্ধান্তই যেহেতু চূড়ান্ত, তাই দশ জনের দলে পরিণত হওয়ার এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত ধাক্কা নিয়েই শেফিল্ড ইউনাইটেডকে বাকি ম্যাচটি চালিয়ে যেতে হয়। একজন খেলোয়াড় কম থাকার সুযোগটি স্বাগতিক পোর্টসমাউথ খুব দ্রুতই কাজে লাগায় এবং নিজেদের আক্রমণভাগের শক্তি বৃদ্ধি করে শেফিল্ডের রক্ষণভাগের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে।
দশ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর শেফিল্ড ইউনাইটেডের জন্য এই ম্যাচটি এক অসম লড়াইয়ে পরিণত হয়। পোর্টসমাউথের ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে এক পর্যায়ে শেফিল্ড ইউনাইটেড ২-০ গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে।
অনেকেই তখন ধরে নিয়েছিলেন যে শেফিল্ডের জন্য এই ম্যাচে আর ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্যই হলো এর অনিশ্চয়তা এবং হার না মানা মানসিকতা। একজন খেলোয়াড় কম থাকা সত্ত্বেও শেফিল্ড ইউনাইটেডের খেলোয়াড়রা অসাধারণ দৃঢ়তা, অদম্য সাহস এবং লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দেন।
তারা নিজেদের রক্ষণভাগ সামলে পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে পোর্টসমাউথের শিবিরে ত্রাস সৃষ্টি করেন এবং অভাবনীয়ভাবে পরপর দুটি গোল পরিশোধ করে ম্যাচে ২-২ গোলের দারুণ এক সমতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
দশ জন খেলোয়াড় নিয়ে দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর এমন দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য আধুনিক ফুটবলে সত্যিই বিরল এবং শেফিল্ডের এই লড়াকু মানসিকতা মাঠে উপস্থিত দর্শকদেরও মুগ্ধ করে।
তবে শেফিল্ড ইউনাইটেডের এই রূপকথার মতো প্রত্যাবর্তনের গল্পটি শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি। ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে এসে তাদের হৃদয় ভেঙে যায়। ঘড়ির কাঁটায় যখন ৮৯ মিনিট, তখন পোর্টসমাউথের খেলোয়াড় এবু অ্যাডামস শেফিল্ডের রক্ষণভাগের একটি ছোট ভুলের সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বল জালে জড়িয়ে দেন।
এই নির্ণায়ক এবং নাটকীয় গোলের মাধ্যমেই পোর্টসমাউথ ৩-২ ব্যবধানের এক রোমাঞ্চকর জয় নিশ্চিত করে। দশ জন নিয়ে অসাধারণ লড়াই করার পরও একেবারে শেষ মুহূর্তের এই গোলে শেফিল্ড ইউনাইটেডকে মাঠ ছাড়তে হয় চরম হতাশা এবং শূন্য হাতে।
পুরো ম্যাচে অবিশ্বাস্য শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করার পরও শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে গোল হজম করাটা শেফিল্ডের খেলোয়াড়দের জন্য ছিল এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক আঘাত। এই অনাকাঙ্ক্ষিত লাল কার্ডের ফলে ইংলিশ ফুটবল লিগ বা ইএফএল-এর নিয়ম অনুযায়ী হামজা চৌধুরীকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ইএফএল-এর সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলামূলক বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় যদি একটি নির্দিষ্ট ম্যাচে পরপর দুটি হলুদ কার্ড দেখার মাধ্যমে লাল কার্ড পেয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হন, তবে তাকে সাধারণত পরবর্তী এক ম্যাচের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।
এই নিয়মের কারণে আগামী শনিবার ব্রিস্টল সিটির বিপক্ষে শেফিল্ড ইউনাইটেডের যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেখানে দলের এই নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডারকে মাঠে দেখা যাবে না।
দলের মাঝমাঠে হামজা চৌধুরীর মতো একজন অভিজ্ঞ এবং পরিশ্রমী খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি শেফিল্ড ইউনাইটেডের কোচিং স্টাফদের জন্য নিশ্চিতভাবেই এক নতুন কৌশলগত চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এই ফুটবলার তার শারীরিক সক্ষমতা এবং রক্ষণাত্মক ক্ষমতার জন্য দলে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন, তাই ব্রিস্টল সিটির বিপক্ষে তার শূন্যস্থান পূরণ করাটা দলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই আবির্ভূত হবে।
ম্যাচ শেষে শেফিল্ড ইউনাইটেডের প্রধান কোচ ক্রিস ওয়াইল্ডার দলের এমন নাটকীয় হার এবং বিশেষ করে রেফারিংয়ের মান নিয়ে নিজের চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরাসরি ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।
ওয়াইল্ডারের দাবি অনুযায়ী, দ্বিতীয় ফাউলের ঘটনার পরপরই রেফারি প্রথমে স্বয়ং হামজাকে মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন যে এই সাধারণ ধাক্কাধাক্কির জন্য তাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হবে না।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে রেফারি তার নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন এবং পকেট থেকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড বের করে হামজাকে লাল কার্ড প্রদর্শন করেন। রেফারির এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বদলের এই ঘটনাটি শেফিল্ড শিবিরের হতাশা ও ক্ষোভকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ফ্রাটন পার্কের এই রাতটি শেফিল্ড ইউনাইটেডের জন্য কেবল একটি হারের রাতই নয়, বরং বিতর্ক, দুর্ভাগ্য এবং অসাধারণ লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার এক দীর্ঘশ্বাস হিসেবেই ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে লেখা থাকবে।