বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফুটবলকে বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি, অশ্রুসিক্ত চোখে কিংবদন্তির আবেগঘন বার্তা

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৩ এএম

ফুটবলকে বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি, অশ্রুসিক্ত চোখে কিংবদন্তির আবেগঘন বার্তা
ছবি : Collected

একুশ বছরের এক দীর্ঘ, বর্ণাঢ্য এবং রূপকথার মতো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত সমাপনী রেখা টানলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাদুকর লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে যিনি গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে এক অবিস্মরণীয় স্পন্দন জাগিয়েছিলেন, তার এই বিদায়বেলায় পুরো ফুটবল বিশ্ব যে এক গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন হবে, সেটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক।

 

বুয়েনস আইরেসের আইকনিক এস্তাদিও মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে যখন তিনি শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামলেন, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো দর্শক থেকে শুরু করে সতীর্থ, কোচ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগণিত ভক্তের চোখে ছিল বেদনার জল।

 

বিদায়বেলায় হাসি এবং কান্নার এক অদ্ভুত মিশ্রণে দাঁড়িয়ে মেসি তার অন্তরের সমস্ত আবেগ, জাতীয় দলের হয়ে অর্জনের তৃপ্তি এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজের গভীর শঙ্কার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। পেশাদারিত্ব ও আবেগের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে তিনি স্মরণ করেন তার এই সুদীর্ঘ যাত্রার কথা।

 

কিংবদন্তি এই তারকার বিদায়ক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে এস্তাদিও মনুমেন্তালে আয়োজনের কোনো ঘাটতি ছিল না। পুরো স্টেডিয়াম যেন সেজেছিল এক বিশাল উৎসবের সাজে, যেখানে প্রতিটি দর্শকের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল কেবল একটি নাম-মেসি।

 

আর এই উৎসবের মাত্রাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় আর্জেন্টিনা দলের অসাধারণ নৈপুণ্য। বিদায়ী এই ম্যাচে প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ৩-০ গোলের এক দুর্দান্ত জয় দিয়ে নিজেদের প্রিয় অধিনায়ককে রাজকীয় বিদায় জানিয়েছে তার দল।

 

ম্যাচটির প্রথমার্ধ গোলশূন্য সমতায় শেষ হলেও, দ্বিতীয়ার্ধে ফুটবল বিশ্ব আরও একবার সেই চিরচেনা জাদুকরী মুহূর্তের সাক্ষী হয়। ম্যাচের তিনটি গোলের প্রতিটিতেই জড়িয়ে ছিল লিওনেল মেসির অনন্য জাদুকরী ছোঁয়া।

 

সতীর্থ নিকোলাস ওতামেন্দি এবং নিকো পাজকে দিয়ে চমৎকারভাবে দুটি গোল করানোর পর, ম্যাচের একেবারে শেষ ভাগে পেনাল্টি থেকে তিনি নিজেই বল জালে জড়ান। আর এই গোলের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের ১২৬তম গোলের অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করে থামলেন আটবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই মহাতারকা।

 

ম্যাচ শেষে বিদায়ী বক্তব্য দেওয়ার জন্য যখন তার হাতে মাইক্রোফোন তুলে দেওয়া হয়, তখন শুরুতে তার মুখে ছিল এক চওড়া ও তৃপ্তিদায়ক হাসি। কিন্তু সেই হাসি খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। মুহূর্তের মধ্যেই সেই হাসিমাখা মুখচ্ছবি এক গভীর আবেগে ঢাকা পড়ে যায় এবং চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।

 

প্রায় মাসখানেক আগে হারানো নিজের প্রিয় বাবাকে স্মরণ করে তিনি তার বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে তিনি কী বলবেন তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। তার মাথার ভেতর অসংখ্য স্মৃতি আর ভাবনা ভিড় করে আসছে।

 

তবে এই বিশেষ রাতের প্রতিটি ক্ষণে যার কথা তার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে, তিনি হলেন তার সদ্য প্রয়াত বাবা হোর্হে মেসি। মেসি অত্যন্ত বিনম্র চিত্তে মাঠে উপস্থিত এবং বিশ্বজুড়ে থাকা দর্শকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

তিনি বলেন, দীর্ঘ বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার এই পবিত্র শার্টটির প্রতিনিধিত্ব করতে পারা তার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং গর্বের বিষয়। নিজের দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে মেসি জানান যে, তারা কখনোই লড়াই থামাননি এবং নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কখনোই কোনো কার্পণ্য করেননি।

 

তার মতে, আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামার চেয়ে সুন্দর এবং আনন্দদায়ক অনুভূতি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। সাম্প্রতিক সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি জানান যে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে তারা আবারও শিরোপা জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।

 

সেই আসরেও তারা নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষের ম্যাচটিকে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সেই ম্যাচে তারা তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই করেছেন।

 

ফুটবল মাঠে তারা যেন সারাজীবনই এক অবিরাম লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। এই জার্সির প্রতি সম্মান এবং ভালোবাসা থেকে তারা যে সর্বদা নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন, সে বিষয়ে কাউকেই কোনো সন্দেহ না রাখার জন্য বিনীত অনুরোধ করেন এই কিংবদন্তি।

 

কথা বলার একপর্যায়ে নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারলেন না মেসি। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেন যে, জাতীয় দলের হয়ে এই মাঠে আর কখনোই খেলোয়াড় হিসেবে ফিরে আসতে না পারার ভাবনাটা তাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে।

 

তিনি তার অন্তরের গভীর থেকে জানান, যদি সম্ভব হতো, তবে তিনি সারা জীবন এই পরিবেশেই ফিরে আসতে চাইতেন। কারণ একজন ফুটবলারের জীবনে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর ও তৃপ্তিদায়ক আর কিছুই হতে পারে না।

 

চিরকাল এই আকাশী-সাদা জার্সিতে মাঠে থাকার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও তিনি বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বলেন যে, বিদায় বলার জন্য এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। নিজের দীর্ঘ পথচলায় পাশে থাকা সতীর্থদের 'বীর যোদ্ধা' হিসেবে আখ্যায়িত করে মেসি তাদের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করেন।

 

তিনি তার সকল সতীর্থকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা যেন তার জীবনের সমস্ত বড় স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমার মতো মহৎ অর্জনগুলো এই সতীর্থদের অক্লান্ত পরিশ্রম ছাড়া কখনোই সম্ভব হতো না।

 

তিনি নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করেন কারণ তিনি সর্বদা এমন সব বীর যোদ্ধাদের দিয়ে পরিবেষ্টিত ছিলেন। দলের ভেতরের এই অসাধারণ পরিবেশটাকে তিনি ভবিষ্যতে ভীষণভাবে মিস করবেন বলে জানান। শুধু সতীর্থরাই নয়, দর্শকদের শর্তহীন ভালোবাসার কথাও তিনি আলাদাভাবে স্মরণ করেন।

 

তিনি বলেন, বিশ্বের যেখানেই তিনি খেলতে গেছেন, প্রতিটি স্টেডিয়াম সর্বদা কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। দর্শকদের এই বিপুল সমর্থন তাকে সবসময় এমন এক অনুভূতি দিয়েছে, যেন তারা পৃথিবীর যেখানেই খেলছেন, সেটাই তাদের নিজেদের আপন ঘর।

 

বিদায়বেলায় কেবল নিজের আবেগ প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি এই দূরদর্শী অধিনায়ক। নিজের উত্তরসূরিদের জন্য শুভকামনা জানানোর পাশাপাশি সামনের কঠিন সময়গুলো নিয়ে সবাইকে আগাম সতর্কও করে দেন তিনি।

 

মেসি জানান, জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা তিনি ভীষণভাবে মিস করবেন, তবে এখন থেকে তিনি মাঠের বাইরের একজন মানুষ হিসেবে এই দলের পাশে থাকবেন। বর্তমান দল এবং ভবিষ্যতে যারা এই দলের হাল ধরবেন, তাদের সবার প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন এবং শুভকামনা থাকবে।

 

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, আগামী দিনে দলের জন্য কঠিন সময় আসতে পারে এবং সেই মুহূর্তগুলোতে সবাইকে একত্রে থাকতে হবে। কারণ, এমন কিছু মানুষ সবসময় থাকে যারা জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখার জন্য অপেক্ষা করে। বড় কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে হলে একটি সুদৃঢ় এবং ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।

 

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল মেসির এই বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের প্রস্থান নয়, বরং এটি একটি সুদীর্ঘ এবং স্বর্ণালী যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। আজ যখন তিনি তার সেই দীর্ঘ যাত্রার ইতি টানলেন, তখন শুধু আর্জেন্টিনার ভক্তরাই নয়, বরং পুরো ফুটবল বিশ্ব এক নীরব শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছে।

 

বক্তব্যের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে মেসি অগণিত ভক্তের হৃদয় ভেঙে দিয়ে এক বেদনাবিধুর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। তিনি পরম আকুতি নিয়ে বলেন যে, তিনি এই জায়গা ছেড়ে যেতে চান না, এই সবুজ মাঠ ছেড়ে যেতে চান না।

 

উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন যে, তিনি সবাইকে ভালোবাসেন এবং সবাইকে ভীষণভাবে মিস করবেন। একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্মগ্রহণ করাকে তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব হিসেবে উল্লেখ করেন এবং নিজের আজন্ম লালিত স্বপ্নপূরণ করতে পেরে তিনি সত্যিই অত্যন্ত গর্বিত বলে তার ঐতিহাসিক বিদায়ী বক্তব্য শেষ করেন।