বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিরাট কোহলির ৩৮তম জন্মদিনে ফিরে দেখা তাঁর দশটি অনন্য ও অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

বিরাট কোহলির ৩৮তম জন্মদিনে ফিরে দেখা তাঁর দশটি অনন্য ও অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাতারকা বিরাট কোহলির ৩৮তম জন্মদিন আজ। ১৯৮৮ সালের ৫ নভেম্বর ভারতের রাজধানী দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করা এই কিংবদন্তি ক্রিকেটার গত আঠারো বছর ধরে বাইশ গজের ক্রিজে নিজের অসামান্য আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন।

 

২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে তিনি শুধু ভারতের নয়, সমগ্র ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম বড় এক ম্যাচজয়ী খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন। অদম্য জেদ, কঠোর পরিশ্রম এবং খেলার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ মনোভাব তাঁকে পরিণত করেছে ক্রিকেট ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে। ব্যাট হাতে তিনি মাঠে নামলেই যেন রেকর্ডের পাতা নতুন করে লেখা শুরু হয়।

 

দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা এবং রানের পাহাড় গড়ার অসামান্য ক্ষমতার জন্য ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে তিনি ‘রান মেশিন’ নামে সমধিক পরিচিত। বৃহস্পতিবার জীবনের আটত্রিশটি বসন্ত পার করলেন কোহলি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর খেলার ধার যেন আরও শানিত হয়েছে।

 

তাঁর এই বিশেষ জন্মদিনে ক্রিকেট বিশ্বের নজর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সুদীর্ঘ এবং বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের দিকে নিবদ্ধ হয়েছে। তাঁর ক্যারিয়ারে এমন অসংখ্য কীর্তি রয়েছে যা সাধারণের কল্পনাতীত, তবে এর মধ্যে বিশেষ দশটি বিশ্বরেকর্ড রয়েছে, যা আগামী প্রজন্মের যেকোনো প্রতিভাবান ক্রিকেটারের জন্যই ভাঙা এক প্রকার অসম্ভব চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে ক্রিকেট বিশ্লেষক-সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে, কোহলির এই অনন্য পরিসংখ্যানগুলো ক্রিকেট ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়ে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে।

 

একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিরাট কোহলির আধিপত্য এককথায় অবিশ্বাস্য। আধুনিক ক্রিকেটে তিনি একদিনের ম্যাচের সমার্থক হয়ে উঠেছেন। এই সংস্করণে সর্বাধিক শতরানের বিশ্বরেকর্ডটি বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে তাঁর একক দখলে রয়েছে।

 

এখন পর্যন্ত একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে মোট পঞ্চান্নটি শতরান। এই অসামান্য মাইলফলক স্পর্শ করার পথে তিনি পেছনে ফেলেছেন তাঁরই একসময়ের সতীর্থ এবং শৈশবের আদর্শ শচীন টেন্ডুলকারকে, যাঁর ঝুলিতে রয়েছে উনপঞ্চাশটি শতরান।

 

বর্তমান যুগে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দাপটে একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কমে এসেছে। তাই ক্রিকেট বিশ্লেষকদের ধারণা, কোহলির এই পঞ্চান্নটি শতরানের রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছানো আগামী দিনের যেকোনো উদীয়মান ব্যাটসম্যানের জন্যই এক চূড়ান্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে।

 

শুধু শতরান নয়, দ্রুততম সময়ে রান তোলার ক্ষেত্রেও তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে দশ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করার কীর্তিও তাঁর দখলে। এই অবিস্মরণীয় রেকর্ডটি গড়তে তিনি সময় নিয়েছিলেন মাত্র ২০৫টি ইনিংস।

 

যেখানে ক্রিকেট ঈশ্বর খ্যাত শচীন টেন্ডুলকারের দশ হাজার রান পূর্ণ করতে প্রয়োজন হয়েছিল ২৫৯টি ইনিংস। অর্থাৎ, পূর্বসূরির চেয়ে পাক্কা চুয়ান্নটি ইনিংস কম খেলেই বিরাট এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। এই একটি পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, একদিনের ক্রিকেটে তাঁর ধারাবাহিকতা কতটা ভয়ংকর এবং রান করার ক্ষেত্রে তিনি কতটা অপ্রতিরোধ্য।

 

ক্রিকেট বিশ্বে বিরাট কোহলিকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে ‘চেজ মাস্টার’ বা রান তাড়া করার জাদুকর বলা হয়। লক্ষ্যমাত্রা যত বড়ই হোক না কেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে তাঁর মাঠে নামা মানেই প্রতিপক্ষের বোলারদের জন্য এক চরম আতঙ্কের মুহূর্ত।

 

একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনশোর বেশি রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তিনি একাই মোট নয়টি শতরান হাঁকিয়েছেন, যা বিশ্ব ক্রিকেটে এক বিরলতম ঘটনা। রান তাড়া করার সময় পাহাড়সম চাপের মুখে নিজের স্নায়ুকে শান্ত রেখে নিখুঁত ব্যাটিং দক্ষতা প্রদর্শন এবং দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়ার যে অসামান্য ক্ষমতা তাঁর রয়েছে, তা তাঁকে সমসাময়িক অন্য সব ক্রিকেটারের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে রেখেছে।

 

নির্দিষ্ট কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রেও তিনি অনন্য। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুধুমাত্র শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধেই তিনি দশটি শতরান করার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছেন। বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে একদিনের সংস্করণে এতগুলো শতরান করার নজির দ্বিতীয়টি নেই।

 

দীর্ঘ সময় ধরে একই প্রতিপক্ষের বোলারদের নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করে ধারাবাহিকভাবে রান তুলে যাওয়ার এই অসামান্য ক্ষমতাই তাঁকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে অধিষ্ঠিত করেছে। সাদা বলের পাশাপাশি লাল বলের ক্রিকেটেও, বিশেষ করে অধিনায়কত্বের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বিরাট কোহলির পারফরম্যান্স এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

 

টেস্ট ক্রিকেটে অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিক দ্বিশতরান করার বিশ্বরেকর্ডটি তাঁরই দখলে রয়েছে। ভারতের সাবেক টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে তিনি মোট সাতবার দুইশো বা তার বেশি রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেছেন।

 

তাঁর আগে এই অভাবনীয় রেকর্ডের মালিক ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান ব্রায়ান লারা, যাঁর অধিনায়ক হিসেবে দ্বিশতরানের সংখ্যা ছিল পাঁচটি। লারার সেই দীর্ঘস্থায়ী রেকর্ড ভেঙে বিরাট নিজেকে টেস্ট ক্রিকেটের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

 

নেতৃত্বের চাপ অনেক সময় খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, কিন্তু কোহলির ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টোটি ঘটেছে; তিনি নেতৃত্বের ভার নিয়ে আরও বেশি আগ্রাসী এবং দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন সংস্করণ মিলিয়ে দ্রুততম আঠাশ হাজার রান পূর্ণ করার অবিস্মরণীয় রেকর্ডটিও কোহলির মুকুটে যুক্ত হওয়া অন্যতম উজ্জ্বল পালক।

 

এই বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করতে তিনি খেলেছেন মাত্র ৬২৪টি ইনিংস। এর আগে এই বিশ্বরেকর্ডটিও ছিল শচীন টেন্ডুলকারের দখলে, যিনি ৬৪৪টি ইনিংস খেলে আঠাশ হাজার রান পূর্ণ করেছিলেন। অর্থাৎ, শচীনের চেয়ে কুড়িটি ইনিংস কম খেলেই কোহলি এই অসামান্য কীর্তি গড়েছেন, যা তাঁর নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

 

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ বা সিরিজ সেরার পুরস্কার জেতার ক্ষেত্রেও বিরাট কোহলি সমসাময়িক সকল মহারথীকে পেছনে ফেলেছেন। তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি মোট বাইশবার সিরিজ সেরার সম্মাননা অর্জন করেছেন।

 

দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবনে টেস্ট, একদিনের ম্যাচ এবং টি-টোয়েন্টি-এই তিনটি ভিন্ন সংস্করণের ক্রিকেটেই সমানতালে দাপট দেখানোর সুবাদেই তিনি এই বিরল সাফল্যের অধিকারী হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বাইরে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলেও বিরাটের রয়েছে কিছু অকল্পনীয় রেকর্ড।

 

২০১৬ সালের আইপিএল মৌসুমে তিনি যেন আক্ষরিক অর্থেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন। ওই একটি মাত্র আসরে মাত্র ষোলোটি ম্যাচ খেলে তিনি অবিশ্বাস্য ৯৭৩ রান সংগ্রহ করেছিলেন। আইপিএলের দীর্ঘ ইতিহাসে এক মৌসুমে কোনো ব্যাটসম্যান আজ পর্যন্ত এত রান করতে পারেননি।

 

এক মৌসুমে প্রায় হাজার রানের কাছাকাছি পৌঁছানোর এই নজির ভাঙতে হলে কোনো খেলোয়াড়কে অতিমানবীয় ফর্ম এবং ধারাবাহিকতার প্রমাণ দিতে হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রতি তাঁর আনুগত্যও এক অনন্য রেকর্ড।

 

আইপিএলের উদ্বোধনী আসর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তিনি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়েই খেলে যাচ্ছেন। মহেন্দ্র সিং ধোনি বা রোহিত শর্মার মতো মহাতারকারা বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খেললেও, কোহলি কখনোই তাঁর দল বদল করেননি।

 

কোহলির ক্যারিয়ারের রেকর্ডের খাতা ঘাটলে এমন কিছু মজার এবং অদ্ভুত পরিসংখ্যানও চোখে পড়ে, যা ক্রিকেট ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তাঁর এমন একটি রেকর্ড রয়েছে যা সত্যিই অভাবনীয়-কোনো বৈধ বল বা লিগ্যাল ডেলিভারি না করেই উইকেট শিকারের কীর্তি!

 

২০১১ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ক্যারিয়ারের প্রথমবারের মতো বল করতে এসে তিনি প্রথম বলটি ওয়াইড করেছিলেন। কিন্তু সেই বলটিতেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে বড় শট খেলার চেষ্টা করেছিলেন ইংলিশ তারকা কেভিন পিটারসন।

 

সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ভারতীয় উইকেটরক্ষক মহেন্দ্র সিং ধোনি তাঁকে দ্রুত স্টাম্পড করে দেন। ফলে কোনো বৈধ বল না করেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উইকেটের মালিক হয়ে যান কোহলি। পরিশেষে বলা যায়, বিরাট কোহলি শুধুমাত্র একজন ক্রিকেটার নন, তিনি আধুনিক ক্রিকেটের এক আস্ত প্রতিষ্ঠান।

 

তাঁর ফিটনেস, আগ্রাসন, আর জয়ের প্রতি অদম্য ক্ষুধা গোটা ভারতীয় ক্রিকেট দলের মানসিকতাকেই বদলে দিয়েছে। আটত্রিশতম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে তাঁর গড়া এই দশটি অবিস্মরণীয় রেকর্ড শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং এগুলো এক অদম্য ক্রীড়াবিদের আজীবন সাধনা, ঘাম এবং রক্তজল করা পরিশ্রমের জীবন্ত দলিল। আগামী দিনের ক্রিকেট বিশ্ব হয়তো নতুন অনেক তারকার জন্ম দেবে, কিন্তু বিরাট কোহলির গড়া এই সাফল্যের পাহাড় টপকানো তাদের জন্য এক প্রায় অসম্ভব রূপকথাই হয়ে থাকবে।