বিশ্ব ফুটবলের দলবদলের বাজারের একেবারে শেষ দিনে, যাকে ফুটবল পরিভাষায় 'ডেডলাইন ডে' বলা হয়, সেই চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে ব্রিটিশ ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় চুক্তির মাধ্যমে চেলসি থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়েছিলেন এই বিশ্বকাপজয়ী তরুণ তুর্কি।
১২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের এক অবিশ্বাস্য ও রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে পা রাখার মাত্র তিন দিনের মাথায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্য দিয়ে নতুন ক্লাবের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে মাঠে নামতে হলো তাকে।
কভেন্ট্রি সিটির বিপক্ষের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এনজোর শুরুতে বেঞ্চে থাকার কথা ছিল, কিন্তু সতীর্থের আকস্মিক চোটে তাকে শেষ মুহূর্তে শুরুর একাদশে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। পুরো ফুটবল বিশ্বের তীক্ষ্ণ নজর ছিল এই মহাতারকার বিশাল দলবদলের দিকে।
লন্ডনের ক্লাব চেলসির হয়ে সময়টা নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে কাটলেও, ম্যানচেস্টার সিটি তার ফুটবলীয় মেধা ও সৃষ্টিশীলতার ওপর যে বিশাল আস্থা রেখেছে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে দলবদলের এই আকাশছোঁয়া অঙ্কে।
এত বড় অঙ্কের আর্থিক চুক্তির চাপ এবং একেবারে নতুন একটি পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে কিছুটা সময় দেওয়ার যৌক্তিক পরিকল্পনা করেছিলেন ম্যানচেস্টার সিটির কোচ এনজো মারেস্কা। সে কারণেই কভেন্ট্রি সিটির বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তাকে সরাসরি মাঠে নামানোর ঝুঁকি থেকে বিরত থাকতে চেয়েছিলেন তিনি।
শুরুর একাদশে মিডফিল্ড সামলানোর মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তরুণ ও প্রতিভাবান খেলোয়াড় নিকো ও’রেইলিকে। কিন্তু ম্যাচের ঠিক আগে মাঠের অনুশীলনে ঘাম ঝরানোর সময় পরিস্থিতি অভাবনীয়ভাবে বদলে যায়।
ম্যাচ শুরুর আগে খেলোয়াড়রা যখন গা গরম করছিলেন, ঠিক তখনই নিকো ও’রেইলি হঠাৎ করেই পেশির মারাত্মক চোটে পড়েন। সুপরিচিত ব্রিটিশ ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম টক স্পোর্টসের বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাঠে অনুশীলনের একপর্যায়ে ও’রেইলিকে তীব্র ব্যথায় কাতরাতে দেখা যায়।
তিনি তার কোমরের দিকে হাত দিয়ে অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও যন্ত্রণাদায়ক অবস্থায় মাঠ ছাড়েন এবং চিকিৎসকদের সাথে সরাসরি টানেল দিয়ে ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করেন। দলের কোচের জন্য এটি ছিল একটি বিশাল কৌশলগত ধাক্কা, কারণ এই নির্দিষ্ট ম্যাচের সমস্ত কৌশল ও মাঝমাঠের পরিকল্পনা তাকে ঘিরেই অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সাজানো হয়েছিল।
কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের পেশাদার ফুটবলে এমন আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য কোচদের সবসময় একটি বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হয়। নিকো ও’রেইলি কোনোভাবেই খেলতে পারবেন না, এটি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই চিকিৎসকদের পরামর্শে শেষ মুহূর্তের জরুরি সিদ্ধান্তে শুরুর একাদশে এনজো ফার্নান্দেজের নাম যুক্ত করা হয়।
এই অপ্রত্যাশিত ও তড়িঘড়ি করে ঘটা অভিষেক এনজো ফার্নান্দেজের জন্য একই সঙ্গে একটি বড় ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও নিজেকে প্রমাণের বিশাল সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়। সাধারণত নতুন কোনো স্বনামধন্য ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর খেলোয়াড়দের দলের খেলার ধরন, কোচের দর্শন এবং সতীর্থদের সাথে মাঠে নিখুঁত বোঝাপড়া তৈরি করতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়।
বিশেষ করে ম্যানচেস্টার সিটির মতো একটি বিশ্বমানের দলে, যেখানে প্রতিটি পজিশনের কৌশলগত দিকগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম, গতিশীল ও জটিল, সেখানে কোনো ধরনের ম্যাচ প্রস্তুতি ছাড়া সরাসরি শুরুর একাদশে মাঠে নামা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই বেশ কঠিন একটি কাজ।
তবে এনজো ফার্নান্দেজ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে নিজেকে আগেই বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছেন। তার মতো একজন উঁচু মাপের ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার খেলোয়াড়ের কাছে দলের প্রয়োজনে যেকোনো প্রতিকূল মুহূর্তে মাঝমাঠের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার মানসিকতা আশা করাটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক।
কোচের আস্থার প্রতিদান দিতে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব দ্রুত নিজেকে প্রস্তুত করে সতীর্থদের সাথে মাঠে নেমে পড়েন। কভেন্ট্রি সিটির বিপক্ষে রোমাঞ্চকর এই ম্যাচটি শুধু এনজো ফার্নান্দেজের জন্যই বিশেষ ছিল না, বরং ম্যানচেস্টার সিটির আরও একজন নতুন খেলোয়াড়ের জন্য এটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দলবদলের বাজারে সদ্য নতুন চুক্তিবদ্ধ হওয়া আক্রমণভাগের প্রতিভাবান খেলোয়াড় ইলিমান এনদিয়ায়েও এই ম্যাচের মধ্য দিয়েই ম্যানচেস্টার সিটির বিখ্যাত আকাশী-নীল জার্সিতে নিজের বহুল প্রতীক্ষিত অভিষেক সম্পন্ন করেছেন।
নতুন এই বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের আগমনে ম্যানচেস্টার সিটির মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের শক্তি যেমন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি মাঠে তাদের রসায়ন ও পারফরম্যান্স নিয়ে ক্লাবটির অগণিত সমর্থকদের মাঝেও বিপুল আশা ও উন্মাদনা কাজ করছে।
নিকো ও’রেইলির দুর্ভাগ্যজনক ও আকস্মিক চোট এনজো ফার্নান্দেজকে দ্রুত মাঠে নামার সুযোগ করে দিলেও, এখন ফুটবল বিশ্বের সব বিশ্লেষক ও সমর্থকদের চোখ থাকবে এই রেকর্ড মূল্যের খেলোয়াড় নতুন ঠিকানায় নিজেকে কীভাবে মেলে ধরেন তার ওপর।
শেষ মুহূর্তের এই নাটকীয় অভিষেক হয়তো সামনের দিনগুলোতে ম্যানচেস্টার সিটিতে তার এক অত্যন্ত সফল ও উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেই ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।