ডারউইনে অনুষ্ঠিত এই টেস্টে তাঁর দৃষ্টিনন্দন ও সংযমী ১০১ রানের ইনিংসটি কেবল বাংলাদেশ দলকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করায়নি, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দীর্ঘতম সংস্করণে তাঁর পরিণত মানসিকতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার পেস সহায়ক পিচে সফরকারী যেকোনো দলের ব্যাটারদের জন্যই শুরুটা সবসময় এক চরম পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে মাঠের সেই প্রতিকূলতা এবং প্রতিপক্ষের বোলারদের আন্তর্জাতিক খ্যাতি নিয়ে আলাদা কোনো বাড়তি চাপ নিজের ওপর চেপে বসতে দেননি তানজিদ তামিম।
দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, বোলারের নাম বা খ্যাতি দেখে তিনি নিজের খেলার ধরন কিংবা কৌশল নির্ধারণ করেননি। বরং ক্রিজে অবিচল থেকে বলের গতি, বাউন্স ও মান বিচার করে শট নির্বাচন করাই ছিল তাঁর মূল দর্শন।
ক্রিকেটের প্রচলিত ভাষায় যাকে বলা হয় বলের যোগ্যতা অনুযায়ী খেলা, ঠিক সেই শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ মেনেই ডারউইনের বাইশ গজে সফলতার এক অনন্য আখ্যান তৈরি করেছেন এই বাঁহাতি ওপেনার।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তানজিদ পরম করুণাময়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন যে, দিনটি তাঁদের পুরো দলের জন্যই ছিল অত্যন্ত চমৎকার ও স্মরণীয়। তিনি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন, দিনের শুরুতেই পুরো দলের প্রাথমিক ও মূল পরিকল্পনা ছিল সকালের প্রথম সেশনটি সম্পূর্ণ সতর্কতার সঙ্গে নিরাপদে পার করে দেওয়া।
কারণ, স্বাগতিক দলের পেসাররা নতুন বলের পূর্ণ সুবিধা নিয়ে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত লাইন ও লেন্থে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন প্রতিকূল অবস্থায় অহেতুক তাড়াহুড়ো বা বাড়তি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলার চেষ্টা না করে চরম ধৈর্য ও শৃঙ্খলা প্রদর্শন করাই ছিল সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
নিজের ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই এমন মর্যাদাপূর্ণ শতকের দেখা পাওয়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত। প্রতিটি ক্রীড়াবিদের জীবনের প্রথম বড় সাফল্য সবসময়ই এক বিশেষ আবেগ, ত্যাগ ও দীর্ঘ সাধনার অনুভূতির সঞ্চার করে। তানজিদ তামিমের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি।
আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম এই ঐতিহাসিক শতকটি তিনি ভালোবেসে উৎসর্গ করেছেন তাঁর জন্মদাতা পিতা ও মাতার উদ্দেশ্যে। অত্যন্ত বিনম্রতার সঙ্গে তরুণ এই ক্রিকেটার জানান, জীবনের এই বিশেষ ও দুর্লভ মুহূর্তটি তিনি তাঁর বাবা-মায়ের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্মারক হিসেবে নিবেদন করতে চান।
তিনি আরও মনে করেন, পরিবারের নিরন্তর ত্যাগ, অনুপ্রেরণা ও প্রার্থনার ফলেই আজ তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন। কঠিন পরিস্থিতিতে ক্রিজে টিকে থাকার মানসিক শক্তি তিনি পরিবার থেকেই অর্জন করেছেন।
শতক স্পর্শ করার শুভলগ্নে ডারউইনের আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত স্থানীয় ও বিশ্ব ক্রিকেট অনুরাগীদের কাছ থেকে পাওয়া প্রাণঢালা উষ্ণ সংবর্ধনা তানজিদের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটেছে।
স্বাগতিক দেশের সমর্থকেরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে যেভাবে একজন সফরকারী দলের ব্যাটারের ঐতিহাসিক অর্জনকে সম্মান জানিয়েছেন, তা যেকোনো খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের জন্যই এক পরম তৃপ্তিদায়ক প্রাপ্তি।
এ প্রসঙ্গে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তানজিদ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, মাঠের দর্শকদের এমন নিঃস্বার্থ অভিবাদন ও ভালোবাসাই হলো টেস্ট ক্রিকেটের প্রকৃত সৌন্দর্য। এই দীর্ঘ সংস্করণের প্রতিটি সেশনের নিঃশব্দ লড়াই এবং লড়াই শেষে পাওয়া এমন নিখাদ স্বীকৃতি তাঁকে ক্রিকেটের আভিজাত্য নতুনভাবে উপলব্ধি করিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠিন বিরুদ্ধ কন্ডিশনে টেস্ট ক্রিকেটের মঞ্চে একজন তরুণের কাছ থেকে পাওয়া এমন সাবলীল, দায়িত্বশীল ও শৈল্পিক ব্যাটিং প্রদর্শন বাংলাদেশ ক্রিকেটের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
টেস্ট ক্রিকেটে উদ্বোধনী জুটিতে দৃঢ়তা এবং ধারাবাহিকতার যে সংকট দীর্ঘদিন ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছিল, তানজিদ হাসানের এই লড়াকু ইনিংস সেখানে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
প্রতিকূল উইকেটে ধৈর্য, সংকল্প ও সঠিক ক্রিকেটীয় কৌশলের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মানসিক দৃঢ়তা ও শৃঙ্খলা থাকলে যেকোনো শক্তিশালী বোলিং লাইনআপের বিরুদ্ধেই আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব। তানজিদের এই অনবদ্য শতকটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।