বিশেষ করে তার জন্মদাত্রী মা সেলিয়া কুচিত্তিনির জন্য এই মুহূর্তটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধুর হয়ে উঠেছে। ছেলের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি পরিবারের সদস্যদের আগে থেকেই জানা ছিল, তবুও আনুষ্ঠানিক বিদায়ের এই ভারী মুহূর্তে নিজেকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছেন না তিনি।
এক বুক হাহাকার নিয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ছেলের বিদায়ের খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর থেকে তিনি এখনও কেঁদেই চলেছেন। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা জার্সিতে মাঠ কাঁপিয়েছেন এই ফুটবল জাদুকর।
জাতীয় দলের হয়ে ২০৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ১২৫টি দর্শনীয় গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে ৬৮টি গোলে সহায়তা করার এক অভাবনীয় ও বর্ণাঢ্য পরিসংখ্যান রেখে গেছেন তিনি।
তার এই আকস্মিক অবসরের খবর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ইন্টারনেট দুনিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বিশ্বজোড়া ভক্ত ও সমর্থকদের মাঝে শুরু হয়েছে এক বিশাল স্মৃতিচারণের ঝড়।
দীর্ঘদিনের সতীর্থ খেলোয়াড়দের আবেগঘন বিদায়ী বার্তার পাশাপাশি বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা অগণিত ফুটবলপ্রেমী তাদের প্রিয় তারকার অবিস্মরণীয় কীর্তি এবং মাঠের জাদুকরী মুহূর্তগুলোকে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।
তবে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে সরে দাঁড়ানোর এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি তার মা সেলিয়া কুচিত্তিনিকে কেবল একজন ফুটবল ভক্ত হিসেবে নয়, বরং একজন মমতাময়ী মা হিসেবে মানসিকভাবে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
এই বিষণ্ণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবারের সদ্য ঘটে যাওয়া আরেকটি অপূরণীয় ক্ষতি ও গভীর শোকের ছায়া। স্বামী এবং লিওনেল মেসির জন্মদাতা পিতা হোর্হে মেসিকে চিরতরে হারানোর মাত্র তেইশ দিনের মাথায় ছেলের এমন একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত সেলিয়ার জন্য পরিস্থিতিকে আরও বেশি অসহনীয় ও কঠিন করে তুলেছে।
পরপর ঘটে যাওয়া এই দুটি হৃদয়বিদারক ঘটনা মেসির পরিবারকে এক অভূতপূর্ব ও কল্পনাতীত মানসিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সম্প্রতি লাতিন আমেরিকার জনপ্রিয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘আমেরিকা টিভি’-কে দেওয়া এক বিশেষ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে সেলিয়া তার বর্তমান মানসিক অবস্থা অত্যন্ত খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন।
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, "আমি এখনও কাঁদছি। যদিও আমরা আগে থেকেই জানতাম যে এমন একটি দিন খুব দ্রুতই আসতে চলেছে, তবুও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তবে এই কষ্টের মাঝেও আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনার বিষয় হলো, ও নিজের এই সিদ্ধান্তে শান্তিতে আছে এবং ব্যক্তিগতভাবে ও সুখী।"
সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি তার সদ্য প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চরম আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সেলিয়া অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করেন, "ওর বাবা বেঁচে থাকতে সবসময় একটা কথা গভীর চিন্তার সঙ্গে বলত, 'ও যেদিন ফুটবল খেলা ছেড়ে দেবে, সেদিন আমি কী নিয়ে থাকব বা কী করব?' ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আসলে সবকিছু একসাথেই ঘটে গেল, যা আমাদের কারও পক্ষেই বিশ্বাস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
ব্যক্তিগত জীবনে লিওনেল মেসির কাছে তার পরিবার সর্বদাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়ে এসেছে। পেশাদার ক্যারিয়ারের যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা ভবিষ্যতের নতুন কোনো রূপরেখা প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি সবসময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে থাকেন।
জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার মতো এত বড় একটি সিদ্ধান্তও সেই স্বাভাবিক পারিবারিক আলোচনার কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। মূলত কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর পরই পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে একান্তে বসে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিজের সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করে ফেলেছিলেন এই কিংবদন্তি।
অর্থাৎ, বিশ্ববাসীর কাছে তার এই অবসরের ঘোষণাটি হঠাৎ করে নেওয়া কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও, বাস্তবে এটি অনেক আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত করে রাখা একটি সুপরিকল্পিত বিদায় ছিল।
আর্জেন্টিনার এই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক নিজের লেখা একটি আবেগপূর্ণ খোলা চিঠিতেও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বিদায়ের এই মর্মস্পর্শী কথাগুলো তিনি বেশ আগেই নিজের হাতে লিখে রেখেছিলেন।
তবে দীর্ঘদিনের এই প্রস্তুতির মাঝেও এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পেছনে তার বাবার আকস্মিক মৃত্যুর একটি সুগভীর ও প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। লিওনেল মেসির জীবনে হোর্হে মেসি কেবল একজন স্নেহময় পিতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক, অভিভাবক এবং ছায়াসঙ্গী।
তাই জীবনের এত বড় একজন অবলম্বনকে চিরতরে হারানোর পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মেসি তার জীবনের পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে শুরু করেছিলেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরবিদায় জানানোর এই কঠিন সিদ্ধান্তটি ত্বরান্বিত হয়েছে।