শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপের ৫৫টি দেশের বিশ্বকাপ বয়কটের কঠোর ঘোষণা

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৪ পিএম

ইউরোপের ৫৫টি দেশের বিশ্বকাপ বয়কটের কঠোর ঘোষণা
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার বিতর্কিত বাণিজ্যিকীকরণ নীতির বিরুদ্ধে এবার অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা।

 

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত ব্যক্তিমালিকানা বা বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনাটি যদি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়, তবে ইউরোপের ৫৫টি সদস্যদেশ বিশ্বকাপসহ ফিফা আয়োজিত সব ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করবে বলে এক অভূতপূর্ব ও কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

 

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় কাঠামোগত ও রাজনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরের অস্তিত্বকেই সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার এক বিশেষ ও জরুরি বৈঠকের পর উয়েফার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, সদস্যদেশগুলো দীর্ঘ আলোচনার পর সর্বসম্মতভাবে এই সম্ভাব্য বয়কটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ফিফার বিভিন্ন মেগা টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার এই বিতর্কিত পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত উয়েফাভুক্ত কোনো দেশের জাতীয় দল ফিফার কোনো টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করবে না।

 

ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই কঠোর সিদ্ধান্তের ফলে ফুটবল বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বিশাল অনিশ্চয়তা ও গভীর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষক ও ক্রীড়া অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে বাদ দিয়ে একটি সফল বিশ্বকাপের আয়োজন কার্যত অসম্ভব।

 

পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শেষ আটের লড়াইয়ে থাকা আটটি দলের মধ্যে ছয়টি দলই ছিল ইউরোপ মহাদেশের প্রতিনিধি। স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানির মতো বিশ্বমানের, ঐতিহ্যবাহী ও তুমুল জনপ্রিয় দলগুলো ছাড়া বিশ্বকাপের বৈশ্বিক আবেদন এবং বিপুল বাণিজ্যিক মূল্য যে মারাত্মকভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের সূত্রপাত মূলত ফিফার একটি নতুন ও উচ্চাভিলাষী বাণিজ্যিক উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি সম্প্রতি ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামের ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের একটি বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠনের মেগা পরিকল্পনা উন্মোচন করেছে।

 

প্রস্তাবিত এই নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নতুন গঠিত এই প্রতিষ্ঠানের শতকরা ২০ ভাগ শেয়ার সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই বিপুল বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় মার্কিন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘থ্রাইভ ইটার্নাল’-এর নেতৃত্বে থাকা প্রখ্যাত ব্যবসায়ী জশুয়া কুশনার সম্ভাব্য প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে আলোচনার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছেন।

 

এই পরিকল্পনা পাসের জন্য ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সদস্যদেশগুলোর ওপর এক ধরনের প্রচ্ছন্ন আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছেন বলে উয়েফার পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সদস্যদেশগুলোর ফুটবল ফেডারেশনকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে তিনি প্রলোভন দেখিয়েছেন যে, প্রস্তাবটি ভোটে পাস হলে ২০২৭ থেকে ২০৩১ চক্রে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি দেশের অনুদান বর্তমানের ৮০ লাখ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি ডলারে উন্নীত করা হবে।

 

এর পাশাপাশি এই প্রস্তাব সমর্থনকারী দেশগুলোকে এককালীন আরও ২ কোটি ডলারের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হবে। অপরদিকে, এই প্রস্তাব যদি ভোটে পাস না হয়, তবে অনুদানের পরিমাণ নেমে আসবে মাত্র ১ কোটি ডলারে।

 

এর সোজা অর্থ হলো, প্রস্তাবের বিপক্ষে গেলে প্রতিটি সদস্যদেশ প্রায় ৩ কোটি ডলারের বিশাল আর্থিক ক্ষতি বা অনুদান থেকে বঞ্চিত হবে। ফিফার এই শর্তযুক্ত প্রস্তাবকে উয়েফা সরাসরি আর্থিক চাপ প্রয়োগ ও অনৈতিক কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

 

উয়েফা তাদের কড়া বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, সদস্য দেশগুলোর জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর সামনে এখন এক ধরনের চরম শর্ত বা আল্টিমেটাম ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। হয় তাদের বিশ্বকাপের মালিকানার একাংশ বেসরকারি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিতে হবে, নয়তো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

 

সংস্থাটির মতে, এটি কোনোভাবেই একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না, বরং এটি ভয় দেখিয়ে সিদ্ধান্ত আদায়ের এক নগ্ন অপচেষ্টা মাত্র। উয়েফা অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বিশ্ব ফুটবল সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্বকাপ ফুটবল কোনো নিছক বিনিয়োগ পণ্য বা ব্যবসার হাতিয়ার নয় এবং এর মালিকানা বিক্রি করার বিন্দুমাত্র অধিকার কারও নেই।

 

তাদের দৃঢ় আশঙ্কা, যেদিন থেকে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা ফিফার প্রতিযোগিতার মালিকানায় যুক্ত হবে, ঠিক সেদিন থেকেই ফুটবলের প্রতিটি সিদ্ধান্ত খেলাটির সার্বিক স্বার্থে নয়, বরং কেবল শেয়ারহোল্ডারদের ব্যবসায়িক মুনাফার স্বার্থে গ্রহণ করা হবে।

 

ফুটবলের ভবিষ্যৎ এমন কোনো ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়, যাদের মূল লক্ষ্যই হলো কেবল সর্বোচ্চ আর্থিক লাভ নিশ্চিত করা। বিশ্বকাপ হলো বৈশ্বিক ফুটবলের অমূল্য সম্পদ, এটি কখনোই বিক্রির জন্য নয়।

 

আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফুটবলের এই সংকটজনক পরিস্থিতির একটি চূড়ান্ত ফয়সালা হতে যাচ্ছে। সেদিন ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের প্রত্যক্ষ ভোটে এই বিতর্কিত প্রস্তাবের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ হবে। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং ফিফা কাউন্সিলের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

 

তাই নিজেদের অবস্থানকে জয়ী করতে এবং ফুটবলের ঐতিহ্য রক্ষায় ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মতো বিশ্বের অন্যান্য মহাদেশীয় কনফেডারেশনগুলোর সমর্থন আদায় করাই এখন উয়েফার জন্য সবচেয়ে বড় ও অস্তিত্ব রক্ষাকারী কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।