শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেসির বিদায় ও বাবার প্রয়াণ নিয়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানালেন মা সেলিয়া!

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

মেসির বিদায় ও বাবার প্রয়াণ নিয়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানালেন মা সেলিয়া!
ছবি : Collected

আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুটবল দল থেকে বিশ্বনন্দিত ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসির অবসর গ্রহণের ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র আবেগ এবং গভীর শূন্যতা। দীর্ঘ দুই দশকের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানার এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই নাড়া দিয়েছে সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে।

 

তবে এই বিদায়ের সুর সবচেয়ে গভীর ও সংবেদনশীলভাবে বেজেছে মেসির পরিবারে। একদিকে আকাশী-সাদা জার্সিকে চিরবিদায় জানানোর বেদনাদায়ক বাস্তবতা, অন্যদিকে সম্প্রতি তার পিতা ও আজীবন পথপ্রদর্শক হোর্হে মেসির আকস্মিক প্রয়াণ-এই দুইয়ের সম্মিলিত অভিঘাত পরিবারটিকে এক গভীর শোকাবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে।

 

এমন এক আবেগাপ্লুত মুহূর্তে ছেলের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং পারিবারিক মানসিক অবস্থা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন মেসির মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি। আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান 'ইন্ত্রুসোস'-এ দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মেসির মা জানান যে, লিওনেল মেসি বেশ কিছুদিন ধরেই জাতীয় দল থেকে নিজের অধ্যায় গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবছিলেন।

 

পারিবারিকভাবে বিষয়টি নিয়ে পূর্বেই আলোচনা হলেও সোমবারের আনুষ্ঠানিক বিদায়ী বার্তা প্রকাশের মুহূর্তটি পরিবারের প্রত্যেকের জন্যই ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও কষ্টকর। সেলিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, যদিও তারা আগে থেকেই জানতেন যে এই দিনটি খুব দ্রুতই আসছে, তবুও আনুষ্ঠানিকভাবে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে পরিবারের সবাই অপরিসীম কষ্টে নিমজ্জিত হয়েছিলেন।

 

বিদায়ের এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সহজ ছিল না। মেসির অনুপস্থিতিতে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলকে মাঠের লড়াইয়ে কল্পনা করা যেকোনো ক্রীড়াপ্রেমীর জন্যই ভীষণ কঠিন। দশ নম্বর জার্সিতে তার বাঁ পায়ের জাদুকরী ড্রিবলিং, রক্ষণভাগ চেরা অবিশ্বাস্য সব পাস এবং দর্শকদের মুগ্ধ করা দূরপাল্লার দর্শনীয় গোলগুলো আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেখা যাবে না।

 

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই জাদুকরকে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে আর না দেখার বেদনা বিশ্বজুড়ে অনুভূত হলেও, একজন স্নেহময়ী মায়ের কাছে ছেলের মানসিক প্রশান্তিই সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সেলিয়া স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মাঠের সাফল্য কিংবা বিশ্বজোড়া খ্যাতির চেয়েও তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার সন্তান মানসিকভাবে ভালো আছে কি না এবং সে ব্যক্তিগত জীবনে সুখী রয়েছে কি না।

 

জাতীয় দলের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গটি দীর্ঘদিন ধরে তাদের পারিবারিক রাতের খাবারের টেবিলে একটি নিয়মিত আলোচনার বিষয় ছিল। সেলিয়া অতীতের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে উল্লেখ করেন, ছেলের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য অবসরের চিন্তা মেসির পিতা হোর্হেকে প্রায়ই বিনিদ্র রাত কাটাতে বাধ্য করত।

 

দীর্ঘ সময় ধরে লিওনেলের এজেন্ট এবং প্রধান অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা হোর্হে মেসি গত আটই আগস্ট একটি স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাবার সেই মানসিক দোলাচলের কথা স্মরণ করে সেলিয়া বলেন, হোর্হে প্রায়ই ভাবতেন যে লিওনেল যেদিন খেলা বন্ধ করে দেবে, সেদিন তারা কী করবেন।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাবার মৃত্যু এবং ছেলের অবসর-দুটি ঘটনাই খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে একসঙ্গে ঘটে গেল, যা তাদের কাছে এখনো অবিশ্বাস্য এক গভীর ট্র্যাজেডির মতো মনে হয়। পিতার প্রয়াণই মূলত জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্তটিকে মেসির কাছে চূড়ান্ত ও অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে।

 

বিদায়ী বার্তায় নিজের মানসিক ক্লান্তির কথা অত্যন্ত অকপটে তুলে ধরেছেন এই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড। মেসি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিন পর, গত একুশে জুলাই তিনি প্রথম এই বিদায়ের বার্তাটি লিখতে শুরু করেছিলেন।

 

সেই প্রাথমিক খসড়ায় তিনি লিখেছিলেন যে তিনি পুরোপুরি নিঃস্ব এবং ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের জাতিকে দেওয়ার মতো নতুন কিছু আর তার অবশিষ্ট নেই। পরবর্তীতে বাবার আকস্মিক প্রয়াণ তার সেই চিন্তাকে আরও বেশি সুদৃঢ় রূপ দেয়।

 

পিতৃশোক ও মানসিক নিঃস্বতার মুখে দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে সরে দাঁড়ানোর এটাই তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও চূড়ান্ত সময়। মেসির এই বিদায় কেবল একটি স্বর্ণালী যুগের পরিসমাপ্তি নয়, বরং এটি একজন মানুষের মানবিক সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং পিতা-পুত্রের অটুট আত্মিক বন্ধনের এক অনন্য আখ্যান।

 

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থক যখন একজন সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর দেখতে না পাওয়ার শূন্যতায় ভুগছেন, তখন মেসির পরিবার পরম মমতায় আগলে রাখছে সেই মানুষটিকে, যিনি দেশের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে অবশেষে ফিরে এসেছেন মানসিক প্রশান্তির খোঁজে।