শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফিফার বিশ্বকাপ স্বত্ব বিক্রি প্রস্তাব ঘিরে বিশ্বজুড়ে টানাপোড়েন!

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম

ফিফার বিশ্বকাপ স্বত্ব বিক্রি প্রস্তাব ঘিরে বিশ্বজুড়ে টানাপোড়েন!
ছবি: সংগৃহীত

সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তাপ কাটার আগেই এক নতুন বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের নীতিগত টানাপোড়েন ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে ক্রীড়াঙ্গন। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেনের বিশ্বজয়ের মাত্র সপ্তাহখানেকের মাথায় শিরোনামে এসেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফার একটি অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক পরিকল্পনা।

 

সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ফিফার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্ট বা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোর স্বত্ব একটি বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক আয় বহুগুণে বৃদ্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।

 

পরিকল্পনার আওতায় এই বর্ধিত আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সব সদস্য দেশের ফুটবল ফেডারেশনগুলোর মধ্যে বণ্টন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাণিজ্যিকীকরণের এই নতুন ধারা বৈশ্বিক ফুটবল কাঠামোর মৌলিক ভিত্তি ও দীর্ঘদিনের সুপ্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক ভারসাম্যকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

 

ফিফার এমন নজিরবিহীন উদ্যোগের বিষয়ে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিজ নিজ মতামত ও মতামতপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিশ্বের সব সদস্য দেশকে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও (বাফুফে) ফিফার পক্ষ থেকে বার্তা এবং মতামত প্রদানের এই আনুষ্ঠানিক আহ্বান লাভ করেছে।

 

তবে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা উয়েফা এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা অঞ্চল নিয়ে গঠিত কনকাকাফ ইতোমধ্যে ফিফার প্রস্তাবটিকে একবাক্যে নাকচ করে দিয়েছে। ফুটবল ঐতিহ্যের স্বকীয়তা বজায় রাখতে এবং খেলাটিকে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের গ্রাস থেকে রক্ষা করতে এই শক্তিশালী আঞ্চলিক সংস্থা দুটি একযোগে ফিফার টুর্নামেন্ট বয়কটের চরম হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছে।

 

তাদের মতে, বিপুল পরিমাণ অর্থের লোভে ফুটবলের ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব কোনোভাবেই বিসর্জন দেওয়া সম্ভব নয়। এই বৈশ্বিক নীতিগত সংকটে বাংলাদেশসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর সামনে একটি জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিশ্বমানচিত্রের একটি বড় অংশই পরিচালনা ও অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড নির্বাহের ক্ষেত্রে সরাসরি ফিফার বার্ষিক উন্নয়ন অনুদান এবং বৈশ্বিক তহবিলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

 

যদি ফিফার এই বিতর্কিত অনুদান ও মুনাফা বণ্টন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হয়, তবে চার বছরের একটি অর্থিক চক্রে বাংলাদেশ অন্তত কয়েকশ কোটি টাকা অর্জনের বিশাল সুযোগ পাবে।

 

অনুন্নত ও বিকাশমান ফুটবলের জন্য অর্থের এই বিপুল আগমন যেমন অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিক থেকে আকর্ষণীয়, তেমনি বৈশ্বিক ফুটবল শক্তিগুলোর চরম বিরোধিতার মুখে পড়া নীতিগত সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়ানোও একটি বড় কূটনৈতিক ঝুঁকি।

 

এই দ্বিমুখী টানাপোড়েনে বাংলাদেশের অবস্থান ঠিক কী হবে, সে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিদ্যমান সার্বিক পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত পরিকল্পনা সম্পর্কে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, নীতিগত গুরুত্ব বিবেচনা করে সম্পূর্ণ বিষয়টি দ্রুতই বাফুফের নির্বাহী কমিটির আগামী যৌথ সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হবে।

 

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কেবল নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বন্ধুত্বপূর্ণ অন্যান্য দেশের ফুটবল ফেডারেশনগুলোর সঙ্গে নিবিড় ও দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ তাদের চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

 

এই বক্তব্যে সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশ এককভাবে কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নিয়ে বৈশ্বিক জোট ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পরবর্তী পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়ার সময়োচিত কূটনীতি গ্রহণ করছে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের উন্নয়নশীল দেশগুলো ঐতিহ্যগতভাবেই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর শক্তিশালী ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। মূলত অনুদান ও আর্থিক সহায়তার বিপুল প্রবাহ বজায় রেখে এর আগেও আন্তর্জাতিক ফুটবল নির্বাচনে ভোটারদের আস্থা অর্জন করার ইতিহাস রয়েছে।

 

এবারও ফিফার এই বিপুল অর্থের প্রতিশ্রুতিকে সেই একই কৌশলগত ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন অনেক অভিজ্ঞ বিশ্লেষক। ইতোমধ্যে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) একটি নীতিগত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে উয়েফা ও কনকাকাফের উত্থাপিত উদ্বেগের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে, যদিও এএফসির ভাষার তীব্রতা ইউরোপীয় ফুটবলের মতো ততটা কঠোর ও কড়া ছিল না।

 

এএফসির পক্ষ থেকে ফিফাকে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে পুরো বাণিজ্যিক বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিষয়টির জটিলতা ব্যাখ্যা করে বাফুফের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং এএফসির নির্বাহী সদস্য মাহফুজা আক্তার কিরণ জানান, এএফসি ইতোমধ্যেই একটি প্রাথমিক বার্তা দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এই গভীর নীতিগত বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ সভা এখনো আয়োজিত হয়নি।

 

ফলে এশিয়ান ফুটবলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং ভবিষ্যৎ অবস্থানের বিষয়টি এখনো পর্যালোচনার টেবিলে রয়েছে। সব মিলিয়ে, একদিকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মৌলিক আদর্শ ও বৈশ্বিক ঐক্যের প্রশ্ন, আর অন্যদিকে বাফুফের বিপুল আর্থিক সহায়তার উজ্জ্বল সম্ভাবনা-এই দুই মেরুর মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জল মেপে এগোতে চাইছে বাংলাদেশের ফুটবল প্রশাসন।

 

বিশ্ব ফুটবলের এই ঐতিহাসিক সংকটে বাফুফের চূড়ান্ত অবস্থান কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক চিত্রকেই প্রভাবিত করবে না, বরং বৈশ্বিক ফুটবল রাজনীতিতেও এশিয়ার কূটনৈতিক ঐক্যের এক তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।