শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এমবাপে ও হালান্ডকে পেছনে ফেলে ইয়ামালের নতুন ইতিহাস

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:২৫ পিএম

এমবাপে ও হালান্ডকে পেছনে ফেলে ইয়ামালের নতুন ইতিহাস
ছবি : Collected

ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের আঙিনায় আরও একবার নতুন ইতিহাসের জন্ম দিলেন বার্সেলোনার তরুণ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল। স্প্যানিশ লা লিগায় রায়ো ভায়েকানোর বিপক্ষে এক শ্বাসরুদ্ধকর ও রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন এই অসামান্য প্রতিভাবান ফুটবলার।

 

বার্সেলোনার ঘরের মাঠ ন্যু ক্যাম্পে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স শুধু দলের বিশাল জয়ই নিশ্চিত করেনি, বরং বিশ্ব ফুটবলের বর্তমান সময়ের দুই মহাতারকা কিলিয়ান এমবাপে এবং আর্লিং হালান্ডকে পেছনে ফেলে তাকে এক অনন্য ও ঈর্ষণীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

 

ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে পঞ্চাশ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করার এক অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক কীর্তি গড়েছেন স্পেনের এই প্রতিভাবান ফরোয়ার্ড, যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করেছে।

 

চলতি মৌসুমের সূচনালগ্নে, বিশেষ করে লিগের প্রথম দুই ম্যাচে লামিন ইয়ামালের পারফরম্যান্স নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষক ও বার্সেলোনার অগণিত সমর্থকদের মাঝে কিছুটা হতাশা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল।

 

ওই দুটি ম্যাচে কাতালান জায়ান্টরা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষের জালে মোট সাতবার বল জড়াতে সক্ষম হলেও, ইয়ামাল ব্যক্তিগতভাবে জালের দেখা পেতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ফর্ম নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ ও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল।

 

অনেকেই মনে করছিলেন বয়সের তুলনায় আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ফুটবলের অতিরিক্ত চাপ হয়তো তার স্বাভাবিক খেলাকে কিছুটা ব্যাহত করছে। তবে বার্সেলোনার নবনিযুক্ত ও অভিজ্ঞ প্রধান কোচ হান্সি ফ্লিক তার এই তরুণ শিষ্যের প্রতিভা ও সামর্থ্যের ওপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও আস্থা হারাননি।

 

কোচের সেই অটুট বিশ্বাস এবং ট্যাকটিক্যাল স্বাধীনতার এক রাজসিক ও মোক্ষম জবাব ইয়ামাল দিয়েছেন মাঠের নৈপুণ্যে। রায়ো ভায়েকানোর বিপক্ষে দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জোড়া গোল করার মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, বড় মঞ্চের বিশাল চাপ সামলে কীভাবে নিজের সেরাটা নিংড়ে দিয়ে দলকে জেতাতে হয়।

 

সোমবার রাতে ঐতিহ্যবাহী ন্যু ক্যাম্পে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে শুরুটা অবশ্য স্বাগতিক বার্সেলোনার জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক বা প্রত্যাশিত ছিল না। ম্যাচের একেবারে শুরুর দিকেই সফরকারী দল রায়ো ভায়েকানো দ্রুতগতির এক প্রতি-আক্রমণ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে গোল করে বসে, যার ফলে স্বাগতিক শিবির দৃশ্যতই কিছুটা প্রবল চাপে পড়ে যায়।

 

তবে বিশ্বমানের দল হিসেবে বার্সেলোনা সেই চাপ খুব বেশি সময় স্থায়ী হতে দেয়নি। দলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা ব্রাজিলিয়ান তারকা রাফিনিয়া দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ের মাধ্যমে একটি চমৎকার গোল করে খেলায় সমতা ফিরিয়ে আনেন। এরপরই শুরু হয় ইয়ামালের পায়ের জাদুকরী প্রদর্শনী।

 

স্পেনের এই তারকা খেলোয়াড় ম্যাচের ২১তম মিনিটে এক অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও দর্শনীয় আক্রমণের মধ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চিরে দলকে লিড এনে দেন। এই গোলটির মাধ্যমেই মূলত তিনি বিশ্ব ফুটবলের রেকর্ডবুক নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছেন।

 

ইয়ামালের এই ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় অর্জনের পর বার্সেলোনা ক্লাবের পক্ষ থেকে তাদের অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে একটি বিশেষ ও আবেগঘন বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেখানে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেওয়া হয়, “ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে লামিন ইয়ামাল পঞ্চাশ গোলের মাইলফলকে পৌঁছে গেছেন।

 

এই অভাবনীয় যাত্রায় তিনি আর্লিং হালান্ড ও কিলিয়ান এমবাপেকে টপকে গেছেন।” বিশ্ব ফুটবলে বর্তমানে হালান্ড ও এমবাপে যে মাত্রার আধিপত্য ও ত্রাস বিস্তার করে আছেন, সেখানে বয়সের দিক থেকে তাদের চেয়েও অনেক কম সময়ে এবং দ্রুততম গতিতে এই কীর্তি গড়া ইয়ামালের জন্য এক অসামান্য ও অবিশ্বাস্য অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

 

ফুটবল বোদ্ধারা মনে করছেন, এই রেকর্ড ইয়ামালের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের একটি ছোট্ট পূর্বাভাস মাত্র। রায়ো ভায়েকানোর বিপক্ষে ৫-২ গোলের এই বিশাল ও দাপুটে জয় লা লিগায় বার্সেলোনার শক্তিশালী এবং রাজসিক অবস্থানেরই একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে।

 

লিগের প্রথম তিনটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষ দলগুলোকে পরাস্ত করে মোট বারোটি গোল আদায় করে নিয়েছে হান্সি ফ্লিকের শিষ্যরা। এর মাধ্যমে তারা ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষ ক্লাবগুলোকেও এক প্রকার কড়া বার্তাই দিয়ে রেখেছে।

 

দলের অভিজ্ঞ পোলিশ স্ট্রাইকার রবার্ট লেভানডোভস্কির অভাবকে বিন্দুমাত্র টের পেতে দিচ্ছে না বার্সেলোনার বর্তমান আক্রমণভাগ। তরুণ একাডেমি খেলোয়াড় ও অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক তারকাদের এক অসাধারণ মেলবন্ধনে বার্সেলোনা এখন ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের হারানো গৌরব ও রাজত্ব পুনরুদ্ধারের পথে অপ্রতিরোধ্য গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

আর এই নতুন যুগের যাত্রায় লামিন ইয়ামাল যে কাতালান দলটির অন্যতম প্রধান কান্ডারি ও আক্রমণভাগের মূল অস্ত্র হতে চলেছেন, তা তার সাম্প্রতিক এই ঐতিহাসিক কীর্তি ও ধারাবাহিক নৈপুণ্য থেকেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।