শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রাজিলের জার্সি তুলে রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালেন নেইমার

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

ব্রাজিলের জার্সি তুলে রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালেন নেইমার
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বর্ণিল, শৈল্পিক ও প্রতিভাবান তারকা নেইমার জুনিয়র অবশেষে ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে নরওয়ের কাছে দুই-এক গোলের অপ্রত্যাশিত ও হৃদয়বিদারক হারের পর থেকেই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা জল্পনাকল্পনা চলছিল।

 

সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে তার করা একমাত্র গোলটি কেবল সেলেসাওদের হারের ব্যবধানই কমিয়েছিল, কিন্তু দলকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। ম্যাচ শেষে চরম হতাশা নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মাঠ ছাড়ার দৃশ্যই যেন বিশ্ববাসীকে তার বিদায়ের এক নীরব ও বিষাদময় বার্তা দিয়ে রেখেছিল।

 

তবে অগণিত ভক্তদের মনে প্রিয় তারকাকে আবারও হলুদ জার্সিতে দেখার যে সামান্য আশা বা সংশয় অবশিষ্ট ছিল, এবার তারও চিরতরে অবসান ঘটালেন স্বয়ং নেইমার। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সিতে তার দীর্ঘ, রোমাঞ্চকর ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটেছে।

 

সম্প্রতি লাতিন আমেরিকার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব প্রতিযোগিতা কোপা সুদামেরিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভেনিজুয়েলার ক্লাব ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালকে চার-দুই গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে নেইমারের বর্তমান ক্লাব সান্তোস।

 

এই অসাধারণ জয়ের পর মিশ্র এলাকায় (মিক্সড জোন) সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জাতীয় দলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা, বাস্তববাদী ও আবেগপূর্ণ কথা বলেন। চৌত্রিশ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি ফুটবলার অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে জানান যে, জাতীয় দলের সঙ্গে তার দীর্ঘ পথচলা একেবারে শেষ হয়ে গেছে।

 

তিনি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই বর্ণাঢ্য যাত্রায় তিনি ইতিহাস গড়েছেন এবং অসংখ্য সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছেন, যা তাকে আজীবন আনন্দ দেবে। ব্রাজিলের হলুদ জার্সির প্রতি নিজের অপরিসীম নিবেদন ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের জন্য তিনি নিজের রক্ত, ঘাম ও জীবন উজাড় করে দিয়েছেন।

 

তবে এখন আর জাতীয় দলের হয়ে এই গুরুদায়িত্ব ও চাপ নিয়ে যাত্রা চালিয়ে নেওয়ার কোনো ইচ্ছে বা শারীরিক সক্ষমতা তার নেই। নেইমারের এই আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য ঘোষণা মূলত ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে চূড়ান্ত মোহর বসিয়ে দিল, যা বিশ্ব ফুটবলের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

 

এখন থেকে তিনি কেবল নিজের দীর্ঘ ক্লাব ক্যারিয়ারের দিকেই সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করবেন বলে জানিয়েছেন। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের হয়ে তিনি সর্বমোট একশত ত্রিশটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

 

এই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি আশিটি আন্তর্জাতিক গোল করার পাশাপাশি উনষাটটি গোলে সহায়তা করেছেন, যা তাকে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে পেলের মতো অবিসংবাদিত কিংবদন্তিদের ছাড়িয়ে এক অনন্য ও ঈর্ষণীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

 

২০১০ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলে তার অভিষেক হয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই তিনি প্রথমবার সিনিয়র দলের জার্সি গায়ে জড়িয়েছিলেন এবং দীর্ঘ ষোলো বছর পর সেই একই স্টেডিয়ামেই তিনি তার বিদায়ের করুণ ইঙ্গিতটি দিয়েছিলেন।

 

বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে করুণভাবে বিদায় নেওয়ার পর নেইমার ব্রাজিলের একটি শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘গ্লোবো টিভি’-কে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের গভীর হতাশা ও বেদনার কথা অকপটে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে, তার আজন্ম লালিত বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের চিরতরে সমাপ্তি ঘটেছে।

 

দলের জন্য নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টার কথা স্মরণ করে তিনি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছিলেন, তিনি সত্যিই আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, নিজের সর্বোচ্চটুকু নিংড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন সবকিছুর অবসান হয়েছে। যেখানে তার আন্তর্জাতিক স্বপ্নের সোনালি সূচনা হয়েছিল, নিয়তির নির্মম পরিহাসে ঠিক সেখানেই তার পরিসমাপ্তি ঘটল।

 

এই বক্তব্যগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, দেশের হয়ে ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের শিরোপা জিততে না পারার আক্ষেপ তাকে কতটা গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নেইমারের অর্জনের খাতা একেবারেই শূন্য নয়, বরং তা যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

 

জাতীয় দলের হয়ে তিনি একমাত্র বড় শিরোপাটি জিতেছিলেন ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপে, যা তাকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন ও পরিণত পরিচিতি এনে দিয়েছিল। এছাড়া ২০১৬ সালে নিজেদের মাটিতে রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমসে অনূর্ধ্ব-তেইশ দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফুটবলে স্বর্ণপদক জয়ের অনবদ্য কীর্তি গড়েছিলেন তিনি।

 

এতসব অভাবনীয় অর্জনের পরও পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নটি তার জন্য কেবল একটি অধরা মরীচিকাই রয়ে গেল। সম্প্রতি ফুটবল অঙ্গনে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে তার অংশগ্রহণের বিষয়ে বেশ কিছু গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে নেইমারের এই সর্বশেষ ও চূড়ান্ত মন্তব্যের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হলো যে, সেই গুঞ্জনগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

 

জাতীয় দলের অধ্যায় চিরতরে শেষ করার পাশাপাশি সম্প্রতি ক্লাব ফুটবলে উদ্ভূত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কেরও অবসান ঘটিয়েছেন এই ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড। কিছুদিন আগে চ্যাপেকোয়েন্সের বিপক্ষে সান্তোসের দুই-দুই গোলে সমতায় শেষ হওয়া একটি হতাশাকর ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে তরুণ সতীর্থদের রূঢ় ভাষায় ভর্ৎসনা করার একটি গুরুতর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছিল।

 

এই বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে জানিয়েছেন, এসব সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন গল্প। একটি নির্দিষ্ট মহলের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। নেইমার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট করেন যে, ম্যাচের পর তিনি কেবল দলকে আরও দায়িত্বশীল হতে এবং ভালো খেলার তাগিদ দিয়েছিলেন।

 

তার মতে, অধিনায়ক হিসেবে সহজে জয় হাতছাড়া না করার কথা বলাটা তার সাধারণ ও পবিত্র দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। দলের অন্য সিনিয়র খেলোয়াড়রা, যেমন লুকাস ভেরিসিমো ও গাবিগোলও সে সময় ঠিক একই মনোভাব পোষণ করেছিলেন বলে তিনি নিশ্চিত করেন।