তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক ও দক্ষ পদক্ষেপে খোয়া যাওয়া আটটি লাগেজ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে এই দুঃসাহসিক চুরির ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ভোরে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার তারাপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে পুলিশ এই সফলতা অর্জন করে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের তারকাদের সরঞ্জাম চুরির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল।
তবে পুলিশের এমন দ্রুতগতিসম্পন্ন পদক্ষেপে জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন আনুষ্ঠানিকভাবে এই লাগেজ উদ্ধার এবং আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মহাসড়কের নিরাপত্তায় এবং অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট তৎপর ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত। এই চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনায় যাদের আটক করা হয়েছে, পুলিশ তাদের পরিচয় বিস্তারিতভাবে গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছে।
আটককৃত চার ব্যক্তি হলেন চারঘাট উপজেলার চামটা গ্রামের মোজাম্মেল হক, যাঁর বয়স ৩২ বছর; পুঠিয়া উপজেলার গণ্ডগোহালী জামতলা গ্রামের ২৩ বছর বয়সী যুবক সোহান রহমান; একই উপজেলার বারইপাড়া গ্রামের ৩৮ বছর বয়সী রুবেল আহমেদ এবং তারাপুর গ্রামের ৫২ বছর বয়সী শাহাদত হোসেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটি আভিযানিক দল গোপন সংবাদ এবং তথ্যপ্রযুক্তির নিবিড় বিশ্লেষণের মাধ্যমে আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর বৃহস্পতিবার ভোরে পুঠিয়া উপজেলার তারাপুর গ্রামের শাহাদত হোসেনের বাসভবনে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পুলিশের তল্লাশিতে মূলত শাহাদত হোসেনের বাড়ি থেকেই ক্রিকেটারদের চুরি যাওয়া লাগেজগুলো অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এই অভিযানের সময় পুলিশ কেবল মালামালই উদ্ধার করেনি, বরং চুরির কাজে ব্যবহৃত তালা ভাঙার বিশেষ সরঞ্জাম এবং অপরাধীদের ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেলও জব্দ করেছে।
এই আটকের মধ্য দিয়ে মহাসড়কে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্রের নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্রিকেটারদের মালামাল চুরি এবং পরবর্তীতে তা উদ্ধারের ঘটনাটি স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থার কর্তাব্যক্তিদেরও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছিল।
রাজশাহী বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সম্মানিত সদস্যসচিব মোজাদ্দেদ জামানী সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য রাজশাহী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে উপস্থিত হন। সেখানে গিয়ে তিনি যা প্রত্যক্ষ করেন, তা এক অর্থে অত্যন্ত বিস্ময়কর ছিল।
তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, গোয়েন্দা কার্যালয়ে আটককৃত আসামি মোজাম্মেল হকের পরনে তিনি সরাসরি ক্রিকেটারদের ব্যবহৃত পোশাক দেখতে পান। একজন অপরাধী চুরি করা খেলোয়াড়দের পোশাক পরিধান করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন দৃশ্য ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তাদের বিস্মিত করেছে।
খেলোয়াড়দের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত সরঞ্জাম এবং পোশাকের প্রতি এমন অনধিকার চর্চা শুধু আর্থিকভাবে নয়, মানসিক দিক থেকেও খেলোয়াড়দের জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। তবে পুলিশের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মূল মালামাল ফিরে পাওয়ার খবরে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারাও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।
এই চুরির ঘটনার সূত্রপাত ঘটে জাতীয় ক্রিকেট লিগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ শেষে ক্রিকেটারদের নিজ শহরে প্রত্যাবর্তনের সময়। জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) দ্বিতীয় রাউন্ডের অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি খেলায় মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে খুলনা বিভাগের মুখোমুখি হয়েছিল রাজশাহী বিভাগ।
সেই খেলা শেষে বুধবার সকালে রাজশাহী বিভাগের খেলোয়াড়েরা আকাশপথে দ্রুততার সঙ্গে রাজশাহীতে ফিরে আসেন। তবে খেলোয়াড়দের যাতায়াত সহজ ও আরামদায়ক করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাদের বিশাল সরঞ্জামাদি ও লাগেজ পরিবহনের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।
এর আগের দিন মঙ্গলবার রাতে খেলোয়াড়দের ব্যবহৃত মোট ৫৪টি গুরুত্বপূর্ণ লাগেজ নিয়ে বিসিবির নিজস্ব একটি কাভার্ডভ্যান ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে সড়কপথে রওনা হয়। এই লাগেজগুলোতে খেলোয়াড়দের দামি ক্রিকেট গিয়ার, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, মূল্যবান ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং নগদ অর্থ সংরক্ষিত ছিল।
নিরাপদ পরিবহনের জন্য কাভার্ডভ্যান ব্যবহার করা হলেও, মহাসড়কের নির্জনতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট চালকের দেওয়া বর্ণনা থেকে জানা যায়, চুরির এই ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক এবং রীতিমতো চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো।
বুধবার ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের পুঠিয়া উপজেলার তারাপুর এলাকায় এই ঘটনাটি সংঘটিত হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বিসিবির ওই কাভার্ডভ্যানটি নাটোরের হরিশপুর বাইপাস মোড়ে পৌঁছানোর পর এর চালক সজীব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে গাড়ি থামিয়ে পেছনের দরজার তালা সঠিকভাবে আটকানো আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকায় তিনি পুনরায় রাজশাহীর দিকে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু কাভার্ডভ্যানটি যখন পুঠিয়ার তারাপুর মোড় অতিক্রম করছিল, ঠিক সেই সময় চলন্ত অবস্থার সুযোগ নিয়ে পেছন থেকে আসা কয়েকজন দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে করে কাভার্ডভ্যানের পিছু নেয়।
মহাসড়কের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা চলন্ত কাভার্ডভ্যানের পেছনের দরজার তালা অত্যন্ত সুকৌশলে ভেঙে ফেলে এবং ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মূল্যবান লাগেজ এবং অন্যান্য মালামাল চলন্ত গাড়ি থেকেই নামিয়ে নেয়। এই অভিনব চুরির ঘটনাটি কাভার্ডভ্যানের চালক সজীব ঘুণাক্ষরেও টের পাননি।
চুরির এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি উপায়ে। কাভার্ডভ্যানের পেছন থেকে আসা অন্য একটি ব্যক্তিগত গাড়ির চালক চলন্ত অবস্থায় তালা ভাঙার এই দৃশ্যটি দেখতে পান। তিনি দ্রুততার সঙ্গে নিজের গাড়ির গতি বাড়িয়ে বিসিবির কাভার্ডভ্যানটির কাছাকাছি আসেন এবং চালক সজীবকে ইশারা দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক করেন।
অন্য একজন চালকের কাছ থেকে এমন সতর্কবার্তা পেয়ে সজীব মহাসড়কের পাশে গাড়ি থামান এবং পেছনে গিয়ে দেখতে পান যে গাড়ির দরজার তালা ভাঙা অবস্থায় ঝুলছে এবং দরজা সামান্য খোলা। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বুঝতে পারেন যে ভয়ংকর কোনো ক্ষতি হয়ে গেছে।
নিরুপায় হয়ে তিনি ভাঙা দরজাটি কোনোমতে আটকে নিয়ে সরাসরি রাজশাহী শহরের নির্ধারিত গন্তব্য হোটেল গ্র্যান্ড রিভারভিউয়ের দিকে রওনা হন। হোটেলে পৌঁছানোর পর তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এবং ক্রিকেটারদের সামনে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলেন।
এরপর সকলের উপস্থিতিতে কাভার্ডভ্যান থেকে মালামাল নামিয়ে গণনা শুরু হয়। হিসাব করে দেখা যায় যে, বিসিবি ডিভিশন ক্রিকেট দলের মোট ৫৪টি লাগেজের মধ্যে ৪৬টি ঠিকভাবে রয়েছে, কিন্তু বাকি আটটি বিভিন্ন আকারের লাগেজ সম্পূর্ণ নিখোঁজ।
এই ঘটনার পরপরই বুধবার সকালে রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পুলিশের সফল অভিযানের পর উদ্ধারকৃত মালামালের তালিকাও গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া সরঞ্জামগুলোর মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত মূল্যবান একটি আইফোন ১৫ প্রো ম্যাক্স স্মার্টফোন, ৩০০ মার্কিন ডলার, একটি ম্যাসাজ বেড যা খেলোয়াড়দের ফিজিওথেরাপির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, একটি ল্যাপটপ, চারটি প্লাস্টিকের বাক্স এবং নগদ আট হাজার বাংলাদেশি টাকা।
প্রায় সব মালামাল উদ্ধার হলেও রাজশাহী বিভাগের ক্রিকেটার মেহরব হাসান জানিয়েছেন যে তাঁর একটি অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তাঁর লাগেজে থাকা অন্যান্য ব্যক্তিগত মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, সেখানে থাকা নগদ প্রায় তিন লাখ টাকা এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
তবে পুলিশ মেহরব হাসানকে এই বলে আশ্বস্ত করেছে যে, খোয়া যাওয়া বিপুল পরিমাণ এই নগদ অর্থ উদ্ধারের জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে তারা জোরালোভাবে আশাবাদী।
এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এই চুরির ঘটনার প্রেক্ষাপটে পুঠিয়া থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মামলাটি সম্পূর্ণভাবে দায়ের হওয়ার পর আটককৃত চার আসামিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং তাদের কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের মালামাল চুরির মতো এমন স্পর্শকাতর একটি ঘটনার এত দ্রুত সমাধান করতে পারায় রাজশাহী জেলা পুলিশ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
এই ঘটনা মহাসড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করলেও, পুলিশের এই সফল অভিযান অপরাধীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও কঠোর বার্তা বহন করে যে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই যুগে এ ধরনের দুঃসাহসিক অপরাধ করে খুব বেশি দিন আত্মগোপন করে থাকা সম্ভব নয়।