মঙ্গলবার বিকেলে যখন জাপানের বিপক্ষে কাবাডি দলের পরাজয়ের খবরে গোটা বাংলাদেশ শিবিরে এক ধরনের শোকাবহ ও হতাশাজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, ঠিক সেই বিষাদময় মুহূর্তেই উশুর আঙিনা থেকে ভেসে আসে এক অভাবনীয় আনন্দের সংবাদ।
নারী উশু খেলোয়াড় জিন্নাত আক্তারের হাত ধরে চার দশক পর এশিয়ান গেমসের ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদকের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। এই অর্জন কেবল জিন্নাতের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্যই এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এদিন দুপুরের পর থেকেই নাগোয়ার টোকাই ডরি ইনডোর স্টেডিয়ামে এক অন্যরকম উত্তেজনা এবং প্রত্যাশার পারদ ক্রমশ বাড়ছিল। সমীকরণটি ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—স্বাগতিক জাপানকে পরাজিত করতে পারলেই কাবাডিতে বাংলাদেশের একটি পদক নিশ্চিত হয়ে যাবে।
কাবাডি যেহেতু বাংলাদেশের জাতীয় খেলা এবং অতীতে এই ইভেন্টে পদক জয়ের বর্ণাঢ্য ইতিহাস রয়েছে, তাই সেখানে বাংলাদেশি ক্রীড়া কর্মকর্তা, সংগঠক ও সংবাদকর্মীদের এক বিশাল ভিড় জমেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাপানের কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ কাবাডি দল, যার ফলে তাদের পদক জয়ের স্বপ্ন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
স্টেডিয়ামে উপস্থিত বাংলাদেশিদের মাঝে যখন সেই পরাজয়ের স্থবিরতা ও হতাশা বিরাজ করছিল, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে উশু থেকে আসে পদক নিশ্চিত হওয়ার এই ঐতিহাসিক খবর। বিষাদের কালো মেঘ সরিয়ে জিন্নাত আক্তারের এই ব্রোঞ্জ জয়ের সংবাদ মুহূর্তের মধ্যেই বাংলাদেশ শিবিরের পরিবেশকে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে তোলে।
এশিয়ান গেমসের এবারের আসরে উশুর নারী ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে অংশগ্রহণ করে এই ইতিহাস রচনা করেছেন বাংলাদেশের প্রতিভাবান অ্যাথলেট জিন্নাত আক্তার। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্ট, বিশেষ করে টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন বা উশুর মতো ডিসিপ্লিনগুলোতে একটি সাধারণ নিয়ম প্রচলিত রয়েছে-যেখানে সেমিফাইনালে পরাজিত অ্যাথলেটদেরও ব্রোঞ্জ পদক প্রদান করা হয়।
এশিয়ান গেমসের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষও এই আন্তর্জাতিক নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করে থাকে। বাংলাদেশ উশু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং দলটির প্রধান কোচ দিলদার হাসান দিলু এই নিয়মটির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, কোয়ার্টার ফাইনালে জিন্নাতের মূল প্রতিপক্ষ ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিযোগী ফ্লোরেন্তিনা থারিসা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ফ্লোরেন্তিনা তার নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি ওজনের (ওভার ওয়েট) অধিকারী ছিলেন, যা উশুর মতো কমব্যাট স্পোর্টসের নিয়মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ওজন সংক্রান্ত এই কঠোর নিয়ম ভঙ্গের কারণে টুর্নামেন্টের রেফারিরা ফ্লোরেন্তিনাকে সরাসরি অযোগ্য বা ডিসকোয়ালিফাইড ঘোষণা করেন। প্রতিপক্ষ অযোগ্য হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশের জিন্নাত কোনো শারীরিক লড়াই ছাড়াই সরাসরি সেমিফাইনালে উন্নীত হন এবং তার ব্রোঞ্জ পদক জয় নিশ্চিত হয়ে যায়।
তবে এই পদক জয়ের খবর প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের মনেই এক ধরনের সংশয়ের জন্ম দিয়েছিল। এর পেছনে একটি যৌক্তিক কারণও ছিল। গত ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে উশুতে বাংলাদেশ পদক পেয়েছে বলে খবর রটেছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় যে, ওই ইভেন্টে প্রতিযোগীর সংখ্যা নির্ধারিত নিয়মের চেয়ে কম থাকার কারণে ব্রোঞ্জ পদক নির্ধারণের জন্য পরাজিত প্রতিযোগীদের মাঝে আলাদা প্লে-অফ ম্যাচ খেলতে হবে। সেই অতীত অভিজ্ঞতার কারণেই আজ অনেকে ভেবেছিলেন এবারও হয়তো একই নিয়মের মারপ্যাঁচে পড়তে হবে বাংলাদেশকে।
কিন্তু সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দিলদার হাসান দিলু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিষ্কার করেন। তার পেশাদার ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নিয়ম হলো যদি কোনো ইভেন্টে প্রতিযোগীর সংখ্যা ছয় জনের কম হয়, তবেই কেবল আলাদা প্লে-অফ আয়োজনের প্রয়োজন পড়ে।
কিন্তু এবারের এশিয়ান গেমসে নারী ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে ১৫ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেছেন। প্রতিযোগীর সংখ্যা পর্যাপ্ত থাকায় এখানে সেমিফাইনালে পরাজিত খেলোয়াড়রাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রোঞ্জ পাবেন। তাই জিন্নাতের পদক জয় নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক কোনো সংশয়ের আর অবকাশ নেই।
বিষয়টি আরও বেশি নিশ্চিত করেছেন এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের শেফ দ্য মিশন মেজর ইমরোজ আহমেদ। তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জানান যে, উশুর সাধারণ সম্পাদক পদকের বিষয়টি তাদের কাছে সম্পূর্ণভাবে পুনরায় নিশ্চিত করেছেন।
এশিয়ান গেমসের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, সেমিফাইনালিস্টরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পদক পেয়ে থাকেন। যেহেতু জিন্নাত আক্তারের সেমিফাইনাল নিশ্চিত হয়ে গেছে, তাই সেই হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের পদকও পুরোপুরি নিশ্চিত।
আয়োজক কমিটির সাথে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা না হলেও গেমসের আন্তর্জাতিক নিয়মাবলি অনুযায়ী এই পদক প্রাপ্তি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। জিন্নাত আক্তারের এই পদক জয়ের পেছনের সমীকরণটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী ৫২ কেজি ওজন শ্রেণির এই ইভেন্টে মোট ১৫ জন খেলোয়াড় নকআউট পদ্ধতিতে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করেন। বাংলাদেশের একমাত্র অ্যাথলেট হিসেবে জিন্নাত আক্তার অত্যন্ত সৌভাগ্যবশত এই রাউন্ডে একটি 'বাই' পান।
এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে নির্ধারিত হন ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেন্তিনা থারিসা। এই ফ্লোরেন্তিনা এর আগে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে ফিলিপাইনের কিলাপোকে পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনালে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ফ্লোরেন্তিনা সফলভাবে তার খেলায় অংশগ্রহণ করলেও, আজকের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের আগে ওজন মাপার সময় তিনি নিজের নির্ধারিত ওজন ধরে রাখতে ব্যর্থ হন এবং টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়েন। এর সরাসরি সুফল পান জিন্নাত আক্তার।
ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের এই নারী ক্রীড়াবিদ সম্পূর্ণ টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি ম্যাচে লড়াই না করেই এশিয়াডের মতো বিশাল মঞ্চের পদক নিজের ঝুলিতে ভরতে সক্ষম হচ্ছেন। বাংলাদেশ ১৯৭৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করে আসছে। দীর্ঘ এই পথচলায় ব্যক্তিগত ইভেন্টে সাফল্য একেবারেই অধরা ছিল।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালে সিউলে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের বক্সার মোশাররফ হোসেন একটি ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছিলেন। সেটিই ছিল এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে কোনো বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদের ব্যক্তিগত ইভেন্টে জয় করা প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র পদক।
এরপর বাংলাদেশ কাবাডিতে একাধিকবার পদক জয় করেছে এবং ক্রিকেটেও পদক জিতেছিল, কিন্তু সেগুলো ছিল পুরোপুরি দলীয় অর্জন। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে কোনো বাংলাদেশির পদক জয়ের যে দীর্ঘস্থায়ী খরা তৈরি হয়েছিল, আজ চল্লিশ বছর পর জাপানের মাটিতে সেই আক্ষেপের অবসান ঘটালেন জিন্নাত আক্তার। চার দশকের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসা ব্যক্তিগত পদকটি বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে চিরকাল একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।