ফ্রান্স ও স্পেনের এই দুই প্রতিভাবান ফুটবলারের কথার লড়াই যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উত্তাপ ছড়াচ্ছে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন আরেক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যারি কেইন। তবে এমবাপ্পে বা ইয়ামালের মতো কোনো দাম্ভিকতা কিংবা জোরালো হুংকার দেখা গেল না ইংল্যান্ড জাতীয় দলের অভিজ্ঞ এই অধিনায়কের কণ্ঠে।
বরং সম্পূর্ণ বিপরীত ও অত্যন্ত বিনয়ী এক অবস্থানে থেকে জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের এই তারকা স্ট্রাইকার নিজের অসাধারণ পরিসংখ্যান তুলে ধরে পুরস্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছেন সম্মানিত ভোটারদের বিবেচনার ওপর।
সম্প্রতি স্পেনের প্রথম সারির ও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ক্রীড়া দৈনিক মার্কা-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ব্যালন ডি’অর মনোনয়ন এবং পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন হ্যারি কেইন।
ইউরোপীয় ফুটবলের রথী-মহারথীদের টপকে ব্যালন ডি’অর র্যাঙ্কিংয়ে এই মুহূর্তে বেশ সুবিধাজনক ও শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত সাবলীল ও পরিশীলিত ভাষায় কেইন বলেন যে, পুরস্কারের এই বিষয়টি আসলেই কিছুটা জটিল সমীকরণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেন যে, গণমাধ্যমের সামনে নিজেকে নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে বা অযথা আত্মপ্রচার করতে তিনি কখনোই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তবে নিজের গত মৌসুমের পারফরম্যান্সের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত অর্জন এবং দলগত সাফল্য-উভয় দিক থেকেই গত মৌসুমটি তার সুদীর্ঘ ফুটবল ক্যারিয়ারের জন্য অসাধারণ এবং অবিস্মরণীয় একটি সময় ছিল।
নিঃসন্দেহে এটি তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সফলতম মৌসুম ছিল বলে তিনি অকপটে স্বীকার করেন। গত মৌসুমে জার্মান ফুটবল জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখ এবং ইংল্যান্ড জাতীয় দলের জার্সি গায়ে হ্যারি কেইন যে অতিমানবীয় ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নিঃসন্দেহে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
পুরো মৌসুমে তিনি সব মিলিয়ে ৭৩টি গোল করেছেন, যা তাকে বর্তমান সময়ের অন্যান্য সব তারকা প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রেখেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১১-২০১২ মৌসুমে আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসির করা ৮২ গোলের পর ইউরোপিয়ান ফুটবলে এক মৌসুমে এটিই কোনো খেলোয়াড়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড।
ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ঘরোয়া লিগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে আসীন হয়ে তিনি ইতোমধ্যে মর্যাদাপূর্ণ 'ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু' নিজের ঝুলিতে পুরেছেন। এই অনবদ্য ও ঈর্ষণীয় পরিসংখ্যানই রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা এমবাপ্পে এবং বার্সেলোনার স্প্যানিশ বিস্ময় বালক ইয়ামালের চেয়ে তাকে এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের লড়াইয়ে যৌক্তিকভাবে ঢের এগিয়ে রাখছে।
নিজের এই জাদুকরী পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মার্কা-এর ওই বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে কেইন আরও কিছু গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় যুক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১১-২০১২ মৌসুমে মাত্র ৬৯টি ম্যাচ খেলে লিওনেল মেসির ৮২ গোল করার সেই অবিশ্বাস্য রেকর্ডের পর, ফুটবল ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হিসেবে ৭৩টি গোল করার এই কীর্তি মূলত মাঠে তার নিজের সক্ষমতারই এক নীরব প্রমাণ দেয়।
এত বড় একটি মাইলফলক স্পর্শ করতে পেরে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত তৃপ্ত ও গর্বিত। তবে এই অভাবনীয় কৃতিত্বের পুরো দাবি তিনি একা নিতে রাজি নন। এমন অসামান্য অর্জনে নিরলসভাবে সাহায্য করার জন্য তিনি তার দলের সব খেলোয়াড়, সতীর্থ এবং সংশ্লিষ্ট কোচিং স্টাফসহ সবাইকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
তার এই মন্তব্য বিশ্ববাসীকে প্রমাণ করে দেয় যে, তিনি ফুটবলের মতো দলীয় খেলায় সতীর্থদের অবদানকে কতটা নিঃস্বার্থভাবে মূল্যায়ন করেন। সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে একজন সত্যিকারের পেশাদার খেলোয়াড়ের মতো নিজের বর্তমান ও ভবিষ্যতের লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন ইংলিশ এই মহাতারকা।
তিনি অত্যন্ত বাস্তববাদী ও পরিণত দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন যে, ব্যালন ডি’অর জয়ের বিষয়টি তো আর তার নিজের হাতে নেই; এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে যারা এই পুরস্কারের জন্য ভোট প্রদান করবেন তাদের স্বাধীন বিচার-বিশ্লেষণ ও বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্তের ওপর।
কেইনের নিজস্ব পেশাদার দৃষ্টিকোণ থেকে, গত মৌসুমের সাফল্য ও পরিসংখ্যান এখন শুধুই অতীত স্মৃতি। তাই তিনি এখন পুরোপুরি বর্তমান মৌসুমের খেলাগুলোর দিকে নিজের সর্বোচ্চ মনোযোগ নিবদ্ধ করেছেন এবং ভবিষ্যতের দিনগুলোতে ক্লাব ও জাতীয় দলের জন্য আরও কী কী বড় অর্জন নিয়ে আসতে পারেন, সেদিকেই তার গভীর দৃষ্টি।
তিনি ভালো করেই জানেন যে, আগামী অক্টোবরে চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম ঘোষণার আগপর্যন্ত ফুটবল বিশ্বে ব্যালন ডি’অর নিয়ে এমন বিস্তর আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলতেই থাকবে, কারণ এটি যেকোনো পেশাদার ফুটবলারের জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও পরম আরাধ্য এক স্বীকৃতি।