মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোপন আলোচনা চলমান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোপন আলোচনা চলমান
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং নতুন করে সংঘাত শুরুর তীব্র আশঙ্কার মাঝেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত কূটনৈতিক তৎপরতার কথা প্রকাশ করেছে কাতার। উপসাগরীয় এই দেশটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত গোপনীয় ও নিবিড় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

 

একদিকে যখন গোটা মধ্যপ্রাচ্য একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই উভয় দেশের মধ্যে চলমান এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বিশ্বশান্তির জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।

 

তবে একই সঙ্গে কাতার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, এই আলোচনা ব্যর্থ হলে বা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা একটি ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

 

কাতারের রাজধানী দোহায় আয়োজিত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরাম’ বা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ফোরামের এক বিশেষ অধিবেশনে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এই চলমান আলোচনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন।

 

তিনি তার বক্তব্যে নিশ্চিত করেছেন যে, ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ইরান পরমাণু চুক্তি, যা আনুষ্ঠানিকভাবে 'জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন' (জেসিপিওএ) নামে পরিচিত, সেই চুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয় ও দৃশ্যমান আলোচনা চলছে।

 

মাজেদ আল-আনসারি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “জেসিপিওএ বা পরমাণু চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে; আমরা উভয় পক্ষের কাছ থেকেই এই আলোচনায় ইতিবাচক অংশগ্রহণ ও সদিচ্ছা দেখতে পাচ্ছি।”

 

তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে, কারণ গত কয়েক বছর ধরে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। এই আলোচনা সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ না করার কারণ ব্যাখ্যা করে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই শীর্ষ কর্মকর্তা কূটনৈতিক গোপনীয়তার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন।

 

তিনি উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের স্পর্শকাতর ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সামনে প্রতিনিয়ত আপডেট দেওয়াটা প্রায়শই আলোচনার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে। মাজেদ আল-আনসারি বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করে বলেন, “আমরা যে এই আলোচনা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত কোনো নতুন খবর শুনছি না, সেটি আসলে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক লক্ষণ।

 

এর অর্থ হলো আমরা আমাদের মধ্যস্থতার কাজটি অত্যন্ত সঠিকভাবে ও নিভৃতে পালন করে যাচ্ছি।” তার এই মন্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, কাতার পর্দার আড়ালে থেকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছে যেখানে উভয় পক্ষ কোনো ধরনের বাহ্যিক বা রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই খোলামেলাভাবে নিজেদের দাবি ও শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কাতারের এই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নতুন কিছু নয়। গত কয়েক দশক ধরে কাতার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে অত্যন্ত সফলভাবে একজন নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে।

 

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মতো দুটি চরম বৈরী ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের মধ্যে যখন সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক বা যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না, তখন কাতারের মতো একটি দেশের ভূমিকা অপরিসীম হয়ে ওঠে।

 

একদিকে কাতারে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত এবং ওয়াশিংটনের সাথে তাদের অত্যন্ত গভীর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সাথেও তারা একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ, কার্যকর ও সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।

 

এই অনন্য ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান কাতারকে এমন একটি বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছে, যার ফলে তারা উভয় পক্ষের কাছেই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বস্ত। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই বর্তমান উত্তেজনার শেকড় মূলত নিহিত রয়েছে ২০১৮ সালের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তে।

 

ওই বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আকস্মিকভাবে ঐতিহাসিক ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে তার দেশকে একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নেন। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার শাসনামলে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল শর্ত ছিল যে, ইরান তার বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচিকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমিত রাখবে এবং এর বিনিময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানের ওপর আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞাগুলো পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেবে।

 

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রত্যাহারের পর তেহরানের ওপর নতুন করে আরও কঠোর ও নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যার ফলে ইরানের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ক্ষুব্ধ ইরানও এর প্রতিক্রিয়ায় চুক্তির শর্তগুলো ধীরে ধীরে লঙ্ঘন করতে শুরু করে এবং নিজেদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়িয়ে দেয়।

 

এর পর থেকেই মূলত দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের শীতল যুদ্ধ এবং চরম আস্থার সংকট বিরাজ করছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ও অস্থিতিশীল।

 

গাজা উপত্যকায় চলমান ইসরায়েল-হামাস সংঘাত, লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হুথিদের ধারাবাহিক আক্রমণ এবং ইয়েমেন, সিরিয়া ও লেবাননসহ বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা পুরো অঞ্চলটিকে একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছে।

 

এর মধ্যে যদি সরাসরি ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত হয়, তবে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এমন একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে, যা নিয়ন্ত্রণ করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

 

এই ধরনের যেকোনো সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত জলপথগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করবে।

 

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের সতর্কবাণীটি মূলত এই ভয়াবহ পরিণতিগুলোকেই ইঙ্গিত করছে। বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানোর জন্য তাই কূটনৈতিক আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ইউরোপে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না।

 

বর্তমান মার্কিন প্রশাসন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে এবং তারা মূলত কূটনৈতিক উপায়ে ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে আগ্রহী। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে চরম অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরানও চায় এই অচলাবস্থার একটি সম্মানজনক সমাধান।

 

দেশের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং সাধারণ মানুষের অসন্তোষ সামাল দেওয়ার জন্য ইরানের অর্থনীতির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার অত্যন্ত জরুরি। তাই উভয় পক্ষের জন্যই এই আলোচনা সফল হওয়াটা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কাতার অত্যন্ত সাবলীল ও পেশাদারিত্বের সাথে এই জটিল আলোচনাগুলো পরিচালনা করছে। পরমাণু চুক্তির মতো এত বড় একটি বিষয়ে রাতারাতি কোনো চুক্তি বা সমাধান আশা করাটা বাস্তবসম্মত নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য, পারস্পরিক আস্থা অর্জন এবং প্রতিটি শর্ত নিয়ে সূক্ষ্ম ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।

 

কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উভয় পক্ষের চরমপন্থী ও কট্টর রাজনৈতিক অবস্থানগুলোকে নমনীয় করে একটি সম্মানজনক মাঝামাঝি অবস্থানে নিয়ে আসা। মাজেদ আল-আনসারির বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনা যেহেতু ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে, তাই আশা করা যায় যে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা নতুন কাঠামোর চুক্তি আলোর মুখ দেখতে পারে।

 

পরিশেষে বলা যায় যে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা বৈশ্বিক শান্তির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কাতারের মধ্যস্থতায় পরিচালিত এই আলোচনা যদি সফলতার মুখ দেখে, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকেই প্রশমিত করবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি বিশাল স্বস্তি নিয়ে আসবে। তবে এই পথটি মোটেও মসৃণ নয়।

 

ছোটখাটো যেকোনো ভুল বোঝাবুঝি, আঞ্চলিক কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত উসকানি বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ যেকোনো মুহূর্তে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে লাইনচ্যুত করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই আলোচনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করতে হবে, যেন বিশ্ব একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়।

 

- আল জাজিরা